মনোজিৎকে ফিরিয়ে দিতে হবে বেতনের টাকা, জেনেনিন প্রমিত–জ়ইব এর কি শাস্তি?

দক্ষিণ কলকাতার আইন কলেজের ভিতরে গণধর্ষণ কাণ্ডে তোলপাড় রাজ্য। এবার এই জঘন্য অপরাধের মূল অভিযুক্ত মনোজিৎ মিশ্র ও তার দুই সঙ্গীর বিরুদ্ধে নেমে এল কঠোর শাস্তির খাড়া। উচ্চশিক্ষা দপ্তরের সিদ্ধান্তের পর মঙ্গলবার কলেজের গভর্নিং বডি (পরিচালন সমিতি) রায় দিয়েছে, শিক্ষাকর্মী হিসেবে মনোজিৎ কলেজ থেকে যে অর্থ এতদিনে পেয়েছে, তা তাকে ফেরত দিতে হবে। পাশাপাশি, অভিযুক্ত দুই ছাত্র প্রমিত মুখোপাধ্যায় ও জ়ইব আহমেদকে কলেজ থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কারের পাশাপাশি, তাদের অন্য কোনো কলেজে ভর্তির পথও বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আইন কলেজের কড়া পদক্ষেপ

গত বছরের অগস্টে আরজি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা যেভাবে নাগরিক সমাজে ব্যাপক আন্দোলন সৃষ্টি করেছিল, কসবার এই ঘটনাও সেই পথেই এগোচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই তিন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সোমবার উচ্চশিক্ষা দপ্তর মনোজিতকে বরখাস্ত এবং প্রমিত ও জ়ইবকে বহিষ্কারের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিলেও, বাকি কড়া পদক্ষেপের ভার ছেড়ে দিয়েছিল কলেজের পরিচালন সমিতির ওপর।

মঙ্গলবার পরিচালন সমিতি এই গণধর্ষণ ঘটনার পর প্রথম বৈঠকে বসে। ৯ সদস্যের জিবি-র মধ্যে ৬ জন বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠকে মনোজিতের বেতন ফেরতের সিদ্ধান্ত ছাড়াও একগুচ্ছ কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে:

  • সময়সীমা নির্ধারণ: এখন থেকে দুপুর দুটো’র পর কোনো শিক্ষার্থী বা কর্মী কলেজে প্রবেশ করতে বা থাকতে পারবে না।
  • কঠোর প্রবেশাধিকার: আই-কার্ড দেখিয়ে তবেই কলেজে ঢুকতে হবে।
  • নিরাপত্তা সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বেসরকারি সংস্থাকে ‘শো-কজ়’ করা হয়েছে। কলেজ কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, এই নিরাপত্তা সংস্থাকে বাতিল করা হবে এবং সকাল সাতটা থেকে দুপুর দুটো পর্যন্ত কলেজ খোলা থাকবে।
  • মহিলা নিরাপত্তারক্ষী: কলেজে এবার থেকে মহিলা নিরাপত্তারক্ষীও রাখা হবে।
  • বহিরাগত প্রবেশ নিষিদ্ধ: কলেজে বহিরাগতদের প্রবেশ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।
  • সিসিটিভি নজরদারি: সারা কলেজে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানোর জন্য সম্প্রতি টেন্ডার ডাকা হয়েছিল। আগে থেকে কিছু ক্যামেরা থাকলেও, যারা সিসিটিভি পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে ছিল, তাদের সঠিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য ‘শো-কজ়’ করা হয়েছে।
  • অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি (ICC): এতদিন কলেজের আইসিসি কার্যকর না থাকলেও, সমিতির বৈঠকে নতুন কমিটি গঠনের প্রস্তাব পাশ হয়েছে।

পরিচালন সমিতির সভাপতির বক্তব্য ও নির্যাতিতার পাশে কলেজ

কলেজ পরিচালনা সমিতির সভাপতি তথা বজবজের তৃণমূল বিধায়ক অশোক দেব জানান, ‘যে নক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে, তার বিরুদ্ধে আরও কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কলেজের তরফে পুলিশ-প্রশাসনকে তদন্তে সব রকম সহযোগিতা করা হবে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘মূল অভিযুক্তর (মনোজিৎ) আইনজীবীর মেম্বারশিপ যাতে বার-কাউন্সিল থেকে বাতিল করা হয়, তার আবেদনও করা হবে।’ অশোক দেবের সংযোজন, নির্যাতিতা ছাত্রীর পরিবার যদি চায়, তাদের চিকিৎসায় কলেজ সব রকম সাহায্য করবে।

অস্থায়ী শিক্ষাকর্মী হিসেবে ২০২৪ সালে কলেজে চাকরি পেয়েছিল মনোজিৎ। দফায় দফায় ৪৫ দিন করে তার মেয়াদ বৃদ্ধি হয়েছিল। এই ঘটনা সামনে আসার পর, কলেজের উপাধ্যক্ষ নয়না চট্টোপাধ্যায় জানান, পরিচালন সমিতি নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সংস্থাকে বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।


 

আদালতে অনুপস্থিত অভিযুক্তরা ও মামলার নতুন মোড়

 

এদিকে, কসবার এই গণধর্ষণের ঘটনায় প্রবল বিক্ষোভের আশঙ্কায় অভিযুক্তদের আলিপুর আদালতে আনা হয়নি। অনলাইন মাধ্যমেই তাদের শুনানি সম্পন্ন হয়েছে। এই মামলার তদন্তে নতুন নতুন তথ্য উঠে আসছে এবং পুলিশও দ্রুততার সঙ্গে পদক্ষেপ নিচ্ছে। এই কঠোর সিদ্ধান্তগুলি আইন কলেজের নিরাপত্তা এবং পঠনপাঠনের পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।