“গণধর্ষণের মামলায় মনোজিৎ গ্রেপ্তার”-কার ফোনে যে কী! ভয়ে সিঁটিয়ে রয়েছে অনেকেই?

নব্বই দশকের জনপ্রিয় গানের লাইন ‘গা ছম ছম, কী হয় হয়!’ এখন যেন তৃণমূল ছাত্র পরিষদের (টিএমসিপি) অন্দরের বাস্তব ছবি। দক্ষিণ কলকাতার আইন কলেজে গণধর্ষণের ঘটনায় মূল অভিযুক্ত টিএমসিপি নেতা মনোজিৎ মিশ্র গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই সংগঠনের অনেক নেতার মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এর কারণ একটাই – মনোজিতের মোবাইলে থাকা সম্ভাব্য আপত্তিকর ছবি, ভিডিও, চ্যাট বা কল রেকর্ডিং, যা টিএমসিপি-র একাধিক প্রভাবশালী নেতার কাছে পাঠানো হয়েছিল।

কেন এই আতঙ্ক?
সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, মনোজিৎ টিএমসিপি-র অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল। অভিযোগ রয়েছে, এর আগেও মনোজিতের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠলেও এই প্রভাবশালী নেতারাই তাকে আড়াল করার চেষ্টা করেছেন। গণধর্ষণের মামলায় মনোজিৎ গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার মোবাইল ফোন ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এর আগে থেকেই মনোজিতের বিকৃত মানসিকতার কথা জানা গিয়েছিল; সে অনেক তরুণীর শরীরের বিভিন্ন অংশের ছবি ও ভিডিও তোলার পাশাপাশি যাদের মারধর করত, সেই ভিডিওগুলোও নিজের মোবাইলে তুলে রাখত। এমনকি, সে এই সব ছবি ও ভিডিও অনেককে শেয়ারও করেছে। ফলে, এখন সেইসব আপত্তিকর তথ্য কার কার কাছে পৌঁছেছে, সেটাই টিএমসিপি-র এই নেতা-কর্মীদের মূল চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মোবাইল থেকে তথ্য মুছে ফেলার হিড়িক:
সূত্রের দাবি, টিএমসিপি-র অনেক নেতা এখন নিজেদের মোবাইল ফোনের গ্যালারিতে হন্যে হয়ে খুঁজছেন মনোজিতের পাঠানো কোনো ছবি, ভিডিও, চ্যাট, কল রেকর্ডিং বা স্ক্রিনশট আছে কি না।

সম্প্রতি টিএমসিপি-র এক প্রাক্তন নেতার কাছে গভীর রাতে ফোন আসে সংগঠনের রাজ্যস্তরের এক শীর্ষ নেতার কাছ থেকে। ওই রাজ্যস্তরের নেতা প্রাক্তন নেতাকে ঘুম থেকে তুলে জানতে চান, “হ্যাঁ রে, আমার সঙ্গে তো মনোজিতের অনেক কথাবার্তা হতো। মনোজিৎ কি তোকে এমন কোনও কথাবার্তার স্ক্রিনশট বা কল রেকর্ডিং কিছু পাঠিয়েছিল? থাকলে আমাকে দে আর তুইও ডিলিট করে দে।” এই কথা শুনে প্রাক্তন নেতা হতবাক হয়ে পাল্টা জবাব দেন, “আমি তো এক বছর হতে চলল সংগঠন ছেড়ে বেরিয়ে এসেছি। ওই সব কি কেউ নিজের কাছে রেখে দেয়?” এর উত্তরে রাজ্যস্তরের নেতা জানতে চান, “তাহলে কার কাছে আছে সাজেশন দে…!”

টিএমসিপি-র দক্ষিণ কলকাতার এক নেতা, যার সঙ্গে মনোজিতের একাধিক ছবি ইতিমধ্যেই ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে, তিনিও এখন নিজের মোবাইল থেকে মনোজিতের পাঠানো ভিডিও এবং কল রেকর্ডিং খুঁজে বেড়াচ্ছেন। এই নেতার বিরুদ্ধেও মনোজিৎকে বিভিন্ন সময় ‘আশ্রয়’ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তার ঘনিষ্ঠ এক ছাত্রের দাবি, “দাদার হোয়াটসঅ্যাপে কোর মেম্বারদের নিয়ে একটা গ্রুপ আছে। সেখানে দিন কয়েক আগেই আমাদের কাছে নির্দেশ এসেছে, যার কাছে মনোজিতের সঙ্গে দাদার যা যা ছবি-ভিডিও-কল রেকর্ডিং আছে সব গ্রুপে পোস্ট করতে হবে। আর নিজেদের মোবাইল থেকে সেই সব ডিলিট করে দিতে হবে। আমার কাছে কয়েকটা ছবি ছিল, গ্রুপে দিয়ে দিয়েছি।”

এমনকি, আইন কলেজগুলির দায়িত্বে থাকা টিএমসিপি-র এক নেতাও এমন ছবি-ভিডিও খুঁজে চলেছেন। তিনি নিজেই বলছেন, “এই ছেলেটার (মনোজিৎ) স্বভাব ছিল যে কারও পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার। এখন ওর ফোনটা বাজেয়াপ্ত হয়েছে। ফরেন্সিকে গিয়েছে। কী থেকে কী হয়, আমিও তাই সব কিছু জোগাড় করে রাখছি। বিরোধীরা তৃণমূলের পিছনে লাগার জন্য বসে আছে। তাই আগে থেকে প্রস্তুত হওয়া ভালো।” অনেক নেতা আবার নিজেদের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল লক করে দেওয়া বা তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার কথা ভাবছেন।

টিএমসিপি-র অবস্থান ও প্রশ্ন:
যদিও টিএমসিপি-র রাজ্য সভাপতি তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য বুধবার বলেন, “কারা এ সব করছেন, আমার জানা নেই। আমরা মনোজিৎকে নিয়ে ভাবিত নই। বরং আমি সংগঠনের জেলা সভাপতিদের নির্দেশ দিয়েছি, মনোজিতের মতো এমন কীর্তিমান সংগঠনে কারা আছেন, তাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ইমিডিয়েট ব্যবস্থা নিতে।”

তবে প্রশ্ন উঠছে, মনোজিৎকে পুলিশ গ্রেপ্তার করার পরে এবং কলেজ থেকে অস্থায়ী কর্মীর চাকরি থেকে বহিষ্কার করা হলেও, টিএমসিপি কি তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কারের ঘোষণা করেছে? টিএমসিপি-র মধ্যে থেকেই এই প্রশ্ন উঠছে। তৃণাঙ্কুরের বক্তব্য, “ও আমাদের কোনও পদে নেই। দক্ষিণ কলকাতায় ২০২২ সালে যে কমিটি তৈরি হয়েছিল, সেখানেও মনোজিৎ ছিল না। ওই কলেজেও কোনও ইউনিট নেই। ফলে ওকে আলাদা করে বহিষ্কার ঘোষণা করার কোনও প্রয়োজন নেই।”

এই অবস্থায় টিএমসিপি-রই প্রাক্তন নেতা প্রান্তিক চক্রবর্তী বুধবার মুখ্যমন্ত্রী সহ প্রশাসনের একাধিক কর্তাব্যক্তিকে ই-মেল করে আইন কলেজগুলির সুরক্ষার জন্য বেশ কিছু দাবি-দাওয়া জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ল কলেজগুলির সুরক্ষার জন্য আলাদা গাইডলাইন, ছাত্রীদের জন্য গ্রিভান্স সেল তৈরি, ছাত্র সংসদে ছাত্র ও ছাত্রীদের সমান সমান প্রতিনিধিত্ব, ছাত্র ভর্তির সময়ে অ্যান্টি র‍্যাগিংয়ের মতো অ্যান্টি মলেস্টেশন, অ্যান্টি রেপ সংক্রান্ত হলফনামা নেওয়া প্রভৃতি। এই ঘটনা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।