কসবার আইন কলেজে গণধর্ষণে কাঁপছে কলকাতা, অভিযুক্তদের ‘তৃণমূল যোগ’, ক্যাম্পাস নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে!

দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম পরিচিত আইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজ, আজ এক বর্বরোচিত গণধর্ষণ কাণ্ডের কেন্দ্রে। কলেজেরই প্রথম বর্ষের এক ছাত্রীকে ক্যাম্পাসের ভেতরে তিনজন মিলে ধর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনা শুধু মহানগরী নয়, রাজ্যজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, কারণ মূল অভিযুক্তসহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের (TMCP) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগসাজশের একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসছে।

মূল অভিযুক্তের পরিচয় ও প্রভাব:

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই ঘটনার মূল অভিযুক্তের নাম মনোজিৎ মিশ্র। সে ২০২২ সালে সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজ থেকে স্নাতক পাশ করে। কলেজের স্থায়ী কর্মী না হলেও, গত ছয়-সাত মাস ধরে অস্থায়ী কর্মী হিসেবে কলেজ চত্বরে তার ব্যাপক প্রভাব ছিল। কলেজ জীবনে মনোজিৎ দক্ষিণ কলকাতার তৃণমূল ছাত্র পরিষদের (TMCP) ইউনিট প্রেসিডেন্ট ছিল এবং জেলা স্তরের TMCP-র সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল। নিজেকে আলিপুর দায়রা আদালতে ‘ক্রিমিনাল লইয়ার’ বা ফৌজদারি আইনজীবী হিসেবেও পরিচয় দিত সে।

স্থানীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, যুব তৃণমূলের প্রেসিডেন্ট হওয়ার লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করছিল মনোজিৎ। কলেজ জীবনে তার বিরুদ্ধে একাধিকবার মারধরের অভিযোগ উঠলেও, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সে বারবার রক্ষা পেয়েছিল।

অন্যান্য অভিযুক্ত ও ঘটনার বিবরণ:

এই ঘটনায় মনোজিত ছাড়াও আরও দুই অভিযুক্তের নাম সামনে এসেছে—একজন প্রথম বর্ষের এবং অন্যজন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। জানা গেছে, এই দুইজনও TMCP-র সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত।

পুলিশের কাছে দায়ের করা অভিযোগে নির্যাতিতা ছাত্রী জানিয়েছেন, গত ২৫ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত প্রায় ১১টা পর্যন্ত কলেজের একটি ঘরে তাকে আটকে রেখে লাগাতার অত্যাচার করা হয়। অভিযোগ, ইউনিয়ন রুমে তাকে ‘জিএস’ করার প্রলোভন দেখিয়ে ডাকা হয়। পরে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়া হলে ছাত্রী তাতে রাজি হয়নি। এরপরই তাকে জোর করে গার্ডরুমে টেনে নিয়ে গিয়ে পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়।

পুলিশি তৎপরতা ও তদন্ত:

ঘটনার পরদিন, ২৬ জুন, নির্যাতিতা ছাত্রী কসবা থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ তৎপরতার সঙ্গে তদন্ত শুরু করে। পার্ক সার্কাসের সিএনএমসি হাসপাতালে নির্যাতিতার প্রাথমিক শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। একইসঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শীদেরও মেডিক্যাল পরীক্ষা এবং বয়ান রেকর্ড করা হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তালবাগান ক্রসিংয়ের কাছ থেকে প্রথম দুই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়। সন্ধ্যা ৭টা ২০ এবং ৭টা ৩৫ মিনিটে তাঁদের আটক করা হয়। এরপর রাত সাড়ে ১২টা নাগাদ মনোজিৎ মিশ্রকে তার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযুক্তদের মোবাইল ফোনও বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা:

যদিও প্রশাসন তিনজন অভিযুক্ত এবং নির্যাতিতার নাম-পরিচয় গোপন রেখেছে, তবে এই ঘটনায় তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলি, বিশেষ করে বিজেপি, শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র সুর চড়িয়েছে। বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী এই ঘটনা নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, “এটা তৃণমূলের ছাত্র সংগঠনের প্রকৃত চরিত্রের প্রকাশ। দোষীদের কড়া শাস্তি দিতে হবে।”

অন্যদিকে, টিএমসিপি জানিয়েছে, সংগঠন এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করছে এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। পুলিশও জানিয়েছে, ধৃতদের কড়া জিজ্ঞাসাবাদ চলছে এবং চার্জশিট প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।

পুরো শহর জুড়ে এই জঘন্য ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন। ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের মধ্যে এই ঘটনায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষাঙ্গনে এমন অরাজকতা ও অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেদিকেই এখন সকলের নজর।