“ধর্ষণ করে একজন, ভিডিও করেছে ২ জন”-জেনেনিন কসবার নির্যাতিতা ছাত্রী যা যা জানালেন?

আর জি করের স্মৃতি এখনও টাটকা। তার রেশ কাটতে না কাটতেই ফের এক গণধর্ষণের ঘটনায় কেঁপে উঠল শহর কলকাতা। কসবার এক নামজাদা আইন কলেজে এক ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনায় পুলিশের জালে তিন অভিযুক্ত। রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর আরও একবার গুরুতর প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে এই ঘটনা। নির্যাতিতা ছাত্রীর অভিযোগ, বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার ‘শাস্তি’ হিসেবেই তাঁর ওপর নেমে আসে এই নারকীয় অত্যাচার।

ঘটনার আদ্যোপান্ত: আতঙ্ক আর হুমকির সেই রাত

২৫শে জুন, সাউথ ক্যালকাটা ল’কলেজের এক প্রাক্তন ছাত্র এবং তার দুই বর্তমান সঙ্গীর হাতে সংঘটিত হয় এই জঘন্য অপরাধ। নির্যাতিতা ছাত্রীর জবানবন্দি অনুযায়ী, কলেজে ঢোকার কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রধান অভিযুক্ত মনোজিত্‍ তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। প্রেমিকের কথা জানিয়ে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে, মনোজিতের আচরণে আসে আকস্মিক পরিবর্তন। অভিযোগ, এরপরই কলেজের প্রধান গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাইরে যাওয়ার সব পথ রুদ্ধ করে ছাত্রীটিকে জোর করে কলেজ ক্যাম্পাসের একটি নির্জন গার্ডরুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই শুরু হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।

পুলিশকে দেওয়া বয়ানে ছাত্রীটি জানিয়েছেন, তিনি আকুতি জানিয়েছেন, কেঁদে গার্ডের পা ধরেছেন, বারবার বলেছেন, “আমার শরীরটা তোমার নয়, দয়া করে ছেড়ে দাও।” কিন্তু কোনো কথা শোনা হয়নি। অভিযুক্তদের একজন তাঁকে পোশাক খুলে ধর্ষণ করে। লোমহর্ষক বিষয় হলো, যখন নির্যাতিতা প্রতিরোধের চেষ্টা করছিলেন, তখন অন্য দু’জন সেই ঘটনার ভিডিও তৈরি করে। শুধু তাই নয়, তাঁকে হুমকি দেওয়া হয় যে, যদি সে কাউকে কিছু বলে, তাহলে এই ভিডিও তার পরিবার এবং বন্ধুদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

আইনের ধারায় অভিযুক্তরা: গণধর্ষণের সঙ্গীন পরিণতি

এই মামলায় ভারতীয় বিচার কোড (আইপিসি)-এর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে, যা অপরাধের গুরুতরতা এবং শাস্তির ব্যাপকতা নির্দেশ করে:

  • ধারা ১২৭(২) – জোরপূর্বক আটকে রাখা: এই ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তিকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে অবৈধভাবে আটকে রাখা হয়, তা একটি গুরুতর অপরাধ। এর জন্য এক বছর পর্যন্ত জেল বা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। এই ক্ষেত্রে, কলেজ ক্যাম্পাসের মূল গেট বন্ধ করে ছাত্রীকে বাইরে যেতে না দেওয়ার বিষয়টি এই ধারার অধীনে আসে।
  • ধারা ৭০(১) – গণধর্ষণের সংজ্ঞা: এটি এই মামলার মূল ভিত্তি। এই ধারা স্পষ্ট করে যে, যদি একাধিক ব্যক্তি কোনো মহিলাকে গণধর্ষণ করে অথবা সেই গণধর্ষণে সহায়তা করে, তবে তাদের সকলের বিরুদ্ধেই গণধর্ষণের অভিযোগ সমানভাবে আনা হবে, এমনকি যদি শারীরিকভাবে কেবল একজন ব্যক্তি ধর্ষণ করে থাকে। অর্থাৎ, এই ঘটনায় একজন মূল ধর্ষক হলেও, বাকি দুই সহযোগীও গণধর্ষণের অভিযোগ থেকে নিষ্কৃতি পাবে না। তাদের সহায়তা এবং ভিডিও ধারণ করার বিষয়টি অপরাধে সক্রিয় অংশগ্রহণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
  • ধারা ৩(৫) – যৌথ উদ্দেশ্য এবং অপরাধের দায়: এই ধারা বলে যে, যদি কোনো গোষ্ঠী কোনো অপরাধ সংঘটিত করে এবং সেই অপরাধ সংঘটনে সকলের উদ্দেশ্য সহযোগিতা করা হয়, তাহলে প্রতিটি সদস্য সেই অপরাধের জন্য সমানভাবে দোষী। গণধর্ষণের ক্ষেত্রে, ঘটনার সময় অভিযুক্তদের মধ্যে পূর্বপরিকল্পিত উদ্দেশ্য না থাকলেও, যদি তারা সকলেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করে, হুমকি দেয় বা ভিডিও তৈরি করে, তাহলে তারা সকলেই সমানভাবে দোষী বলে বিবেচিত হবে।

শাস্তি কী হতে পারে?

ধারা ৭০ এর অধীনে গণধর্ষণের সর্বনিম্ন শাস্তি হল ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, যা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড (আজীবন কারাদণ্ড) পর্যন্ত হতে পারে এবং এর সঙ্গে জরিমানাও করা যেতে পারে। এই মামলায়, যদিও শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি শারীরিকভাবে ধর্ষণ করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে অভিযোগ, তবুও বাকি দুই অভিযুক্তের সক্রিয় সহযোগিতা এবং হুমকি প্রদানের কারণে তিনজনের বিরুদ্ধেই গণধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছে।

আর জি করের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কতটা কঠোর পদক্ষেপ নেয় এবং শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কতটা সফল হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। এই ঘটনা কেবল একটি আইনি লড়াই নয়, এটি সমাজের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা যে, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কোনো আপস নয়।