“রথের রশি টানে মুসলিম পরিবার”-রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে সম্প্রীতির নিদর্শন, জেনেনিন কোথায়?

হাওড়ার আমতা থানার তাজপুরের রায় পরিবারের রথ এ বছর ৪০০ বছরে পা দিল, যা ‘শ্রীধর রথ’ নামেই অধিক পরিচিত। এই রথযাত্রার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি হলো এর সম্প্রীতির নিদর্শন। জগন্নাথের বদলে এখানে রায় পরিবারের কুলদেবতা শ্রীধর (একটি শালগ্রাম শিলা) রথে উপবিষ্ট হন, এবং সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রতি বছর এই রথের রশি টেনে রথযাত্রার সূচনা করেন স্থানীয় একটি মুসলিম পরিবারের সদস্যরা। বংশপরম্পরায় তারাই এই রথযাত্রার যাবতীয় ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকেন। ভূ-ভারতে এমন সম্প্রীতির চিত্র বিরল বলেই মনে করা হয়।
রথযাত্রার মূল আবর্তন: স্থান ও রীতিনীতি
হাওড়ার বাগনানের কড়িয়া থেকে আমতার নারিটের পথে চক স্টপেজ, সেখান থেকে গ্রামের রাস্তা চলে গিয়েছে বেতাই বন্দরের দিকে। সেই রাস্তার অদূরেই রায়দের বসতবাড়ি। বাড়ির পাশেই পুরোনো মন্দিরে নিত্য পূজিত হন রায়বাড়ির কুলদেবতা শ্রীধর। রায়দের বসতভিটা থেকে কয়েকশো মিটার দূরে রাস্তার ধারে একটি টিনের ঘরে সযত্নে রাখা থাকে এই ঐতিহাসিক রথটি।
রথযাত্রার দিন মন্দির থেকে শ্রীধরকে পালকিতে করে রথে নিয়ে আসা হয়। প্রথা মেনে মোট সাতজন ব্রাহ্মণ এই কাজটি সম্পন্ন করেন। এরপরই শুরু হয় রথ টানা। এই কাজে মুখ্য ভূমিকা পালন করে তাজপুরের লাগোয়া সারদা গ্রামের কাজি পরিবার। গত প্রায় একশো বছর ধরে এই মুসলিম পরিবারটি এই গুরুদায়িত্ব পালন করে আসছে। বর্তমানে এই দায়িত্ব বর্তেছে পরিবারের অন্যতম সদস্য সাকু কাজির ওপর। এর আগে তাঁর বাবা খালেক কাজি এই দায়িত্ব সামলেছিলেন।
একটি মুসলিম পরিবার কেন রথযাত্রার সঙ্গে জড়িত?
রায় পরিবারের অন্যতম বর্ষীয়ান সদস্য মানস রায়, যাঁর বয়স এখন সত্তরের কাছাকাছি, শোনালেন এই রথযাত্রার এক মন ছুঁয়ে যাওয়া ইতিহাস। তাঁর কাছ থেকে জানা গেল, তাজপুরের রায় পরিবারের সদস্যরা একসময় বর্ধমান মহারাজের দেওয়ান ছিলেন। তাঁদের একজন ছিলেন দুর্লভ রায়, যাঁর উত্তরাধিকারী ছিলেন মুকুট রায়। প্রায় ৪০০ বছর আগে তদানীন্তন বর্ধমান মহারাজের অনুরোধে মুকুট রায় তাজপুর গ্রামে এই রথযাত্রার প্রচলন করেন।
তখন তাজপুর ছিল একটি অজপাড়া গাঁ, যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না বললেই চলে। তবুও রথযাত্রাকে ঘিরে মানুষের উৎসাহের কোনো কমতি ছিল না। রথযাত্রা উপলক্ষে বিশাল মেলা বসতো, যেখানে আশপাশের গ্রামের মানুষজন স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিতেন।
১৯৪৬ সালের দাঙ্গা ও খালেক কাজির ভূমিকা
এই সম্প্রীতির মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছিল ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়। যখন বাংলা জুড়ে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল এবং তার আঁচ তাজপুর গ্রামেও এসে পৌঁছেছিল, তখন রথ টানা হবে কি না, তা নিয়ে রায় পরিবার দোটানায় পড়ে গিয়েছিল। সেই অশান্ত পরিস্থিতিতে ঢাল হয়ে এগিয়ে আসেন পাশের গ্রামের বাসিন্দা খালেক কাজি।
মুসলিম সম্প্রদায়ের লোক হয়েও তিনি রায় পরিবারের লোকেদের অভয় দিয়েছিলেন যে, প্রতি বছর যেমন রথ টানা হয়, তেমনই হবে; রথযাত্রা কোনোভাবেই বন্ধ করা যাবে না। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন এগিয়ে আসেন। খালেক কাজি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে রথ টানার ব্যবস্থা করেন। তাঁর এই পদক্ষেপ দেখার পর রায় পরিবারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়, এরপর থেকে রথের রশি টানবেন খালেক কাজি।
মানস রায় বলেন, “সেই ট্র্যাডিশন এখনও চলছে। খালেক না থাকলেও তাঁর ছেলে এখন রথের রশি ধরেন। বলতে পারেন, এটাই আমাদের রথের বিশেষত্ব।” সাকু কাজি যোগ করেন, “এটা আমাদের কাছে একটা মিলন উৎসব। সব সম্প্রদায়ের মানুষ এই রথযাত্রায় অংশ নেন। এটাই আমাদের বাংলার সংস্কৃতি।”
এলাকার ভূমিপুত্র তথা আমতার বিধায়ক সুকান্ত পাল বলেন, “ছোটবেলা থেকেই এই রথের সঙ্গে যুক্ত আছি। সব সম্প্রদায়ের মানুষ এতে অংশ নেন। রথের মেলাকে ঘিরে গোটা এলাকা উৎসবের চেহারা নেয়।”
এই রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালির সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের এক জীবন্ত প্রতীক, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হচ্ছে।