বিশেষ: ১১৪ বছরের ইতিহাস, পুরুলিয়ার পথে হাঁটছে মণি বাইজির রথ, জেনেনিন বিস্তারিত

পুরুলিয়ার চক বাজারের রাধা গোবিন্দজিউ মন্দির থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রথতলায় শেষ হয় এক ঐতিহাসিক যাত্রা, যা ১১৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে পুরুলিয়ার মাটিকে এক বিশেষ ঐতিহ্য বহন করে চলেছে – লোকমুখে পরিচিত ‘মণি বাইজির রথ’। পিতলের তৈরি এই প্রাচীন রথ দেখতে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আজও ভিড় জমান অসংখ্য মানুষ। ছৌ-পলাশের এই ভূমিতে রথযাত্রা এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।

মণি বাইজি থেকে মনমোহিনী বৈষ্ণবী: এক বাইজির বৈষ্ণব হয়ে ওঠার গল্প
এই রথের নেপথ্যে রয়েছে এক চমকপ্রদ ইতিহাস। মণি বাইজি পুরুলিয়ার আদি বাসিন্দা ছিলেন না। জানা যায়, যখন পুরুলিয়া পঞ্চকোট রাজবংশের শাসনাধীন ছিল, সেই সময় রাজা রাজেন্দ্রনারায়ণ সিং দেও-এর নাচ-গানের প্রতি দারুণ উৎসাহ ছিল। তাঁর জলসা ঘরের জন্য তিনি লখনৌ থেকে মুন্নি বাই নামে এক বাইজিকে নিয়ে আসেন। রাজকীয় আনুকূল্যে নাচ-গানের জীবনেই তিনি বৈষ্ণব ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং দীক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর তাঁর নতুন নাম হয় মনমোহিনী বৈষ্ণবী।

১৮৯৮ সালে মনমোহিনী বৈষ্ণবী পুরুলিয়ার চকবাজারে একটি মন্দির নির্মাণ করে সেখানে রাধাগোবিন্দ জিউর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। এরপরই তাঁর মনে রথযাত্রার আয়োজনের ভাবনা আসে। তিনি বাঁকুড়া জেলার প্রখ্যাত কারিগর আশুতোষ কর্মকারের খোঁজ পান এবং তিনিই রথ নির্মাণের কাজ শুরু করেন।

রথের ঐতিহাসিক যাত্রা এবং বিবর্তন
১৯১২ সালে পুরুলিয়ার রাজপথে নানা দেবদেবী এবং অসাধারণ কারুকার্যে ভরা পিতলের সেই রথের রশিতে প্রথম টান পড়ে। সে সময় এই রথটি দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে ছিল ১২ ফুট এবং উচ্চতায় প্রায় ২২ ফুট। মনমোহিনী বৈষ্ণবী তাঁর জীবনাবসানের আগে পর্যন্ত, অর্থাৎ ১৯১৮ সাল পর্যন্ত প্রত্যেক রথযাত্রায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন।

এই রথযাত্রা পরিচালনার জন্য মনমোহিনী একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করেছিলেন। চকবাজারের নন্দলাল দত্ত কয়ালের পরিবার সেই ট্রাস্টি বোর্ডের অন্যতম এগজ়িকিউটর হিসেবে ১৯২২ সাল থেকে বংশানুক্রমে এই দায়িত্ব পালন করে আসছে। সেই বংশেরই বর্তমান পরিচালক, বর্ষীয়ান শচীদুলাল দত্ত এখন রথযাত্রার মূল দায়িত্বে রয়েছেন।

শচীদুলাল দত্ত শোনালেন মণি বাইজির রথের বিবর্তনের গল্প। তিনি জানান, “শুরুতে এই রথযাত্রা সূর্যাস্তের আগেই শেষ হয়ে যেত। ১৯৬৩ সালে গ্যাসবাতির আলোয় রথটিকে সাজিয়ে সন্ধের পর রথযাত্রা শুরু হয়। তার আট বছর পরে রথটিকে সাজানো হয় বৈদ্যুতিক আলোয়।” সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রথের আকারও পরিবর্তিত হয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, “রাস্তা সরু হয়ে যাওয়ায় ১৯৬৯ সালে আর এক কারিগর গিরিধারী কর্মকার চার দিক থেকে দুই ফুট করে কমিয়ে রথটির আকার পরিবর্তন করেন। ২০০০ সাল থেকে ট্র্যাক্টরের সঙ্গে দড়ি বেঁধে রথ টানা শুরু হয়, তবে সেই দড়িতে হাত ছোঁয়ানোর ঐতিহ্য আজও অসংখ্য মানুষের মধ্যে দেখা যায়।”

এভাবেই পুরুলিয়ার এই রথযাত্রা যুগ যুগ ধরে ইতিহাস, বিশ্বাস আর ঐতিহ্যের ধারা বহন করে চলেছে।