এটিএম-এ অনিরাপত্তা, শিলিগুড়িতে ফের লুঠ, দায় ঠেলছে ব্যাঙ্ক-পুলিশ!

শিলিগুড়িতে এটিএম লুঠের ঘটনা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ময়নাগুড়ির ঘটনার এক সপ্তাহের মধ্যেই এবার শিলিগুড়িতে দশ লক্ষ টাকারও বেশি লুঠ হয়েছে একটি এটিএম থেকে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দুটি ক্ষেত্রেই এটিএম কাউন্টারগুলোতে কোনো নিরাপত্তারক্ষী ছিল না। এই অনিরাপদ এটিএম কাউন্টারগুলোই এখন শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু দায় চাপাচ্ছে ব্যাঙ্ক এবং পুলিশ কর্তৃপক্ষ একে অপরের উপর।
নিরাপত্তাহীনতার শিকার ‘সফট টার্গেট’ এটিএম
শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেট বারবার ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে এটিএমগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিলেও, অভিযোগ উঠেছে যে ব্যাঙ্কগুলো এই বিষয়ে কার্যত ভ্রুক্ষেপ করছে না। আর এই ঢিলেঢালা নিরাপত্তার কারণেই এটিএম কাউন্টারগুলো দুষ্কৃতীদের কাছে ‘সফট টার্গেট’ হয়ে উঠেছে। ময়নাগুড়ির ঘটনায় চার দুষ্কৃতী গ্রেফতার হলেও, শিলিগুড়ির ঘটনায় এখনও কেউ ধরা পড়েনি।
ব্যাঙ্ক কর্মীদের অভিযোগ: পুলিশের চাপ নেই!
ব্যাঙ্ক কর্মীদের একাংশ অভিযোগ করছেন যে, এটিএম লুটের মতো ঘটনা ঘটার পরও পুলিশ বিভিন্ন ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট চাপ দিচ্ছে না। ফলে কাউন্টারগুলির নিরাপত্তায় ত্রুটি থেকেই যাচ্ছে। তাঁরা দাবি তুলেছেন, স্পর্শকাতর এলাকার এটিএম কাউন্টারগুলিতে অন্তত রাতে সশস্ত্র গার্ড মোতায়েন করা হোক।
বঙ্গীয় প্রাদেশিক ব্যাঙ্ক কর্মচারী সমিতির রাজ্য সহ-সম্পাদক এবং দার্জিলিং জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক লক্ষ্মী মাহাতো বলেন, “রাজ্যে এটিএম কাউন্টারের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। শুধু শিলিগুড়ি নয়, গোটা রাজ্যেই অধিকাংশ কাউন্টারের নিরাপত্তায় ত্রুটি রয়েছে। প্রতিটি কাউন্টারে সর্বক্ষণ গার্ড মোতায়েন করতে হবে। স্পর্শকাতর কাউন্টারে মোতায়েন করতে হবে সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী। শীঘ্রই এই দাবিতে আমরা আন্দোলনে নামব।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “অপরাধ সংগঠিত হওয়ার পরও ব্যাঙ্কের ম্যানেজমেন্টকে নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য পুলিশও চাপ দেয় না। ফলে কাউন্টারগুলিতে নিরাপত্তা বাড়ানোর কোনও উদ্যোগ নেই ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ।”
ব্যাঙ্কের পালটা দাবি: ‘ই-সার্ভেল্যান্স’ ব্যবস্থা কার্যকর!
অন্যদিকে, এক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ম্যানেজার রাজেশ কুমার এই অভিযোগ মানতে নারাজ। তিনি বলেন, “প্রতিটি কাউন্টারে ই-সার্ভেল্যান্স ব্যবস্থা রয়েছে। অপরাধ সংগঠিত করার চেষ্টা চললেই অ্যালার্ম বাজার কথা। সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাটি সম্পর্কে এসএমএস যাওয়ার কথা স্থানীয় পুলিশের কাছেও। কাজেই নিরাপত্তা ঢিলেঢালা রয়েছে বলে অভিযোগ ঠিক নয়।”
পুলিশের বক্তব্য: দায় ব্যাঙ্কের!
শিলিগুড়ি শহর-সহ দার্জিলিং জেলায় এটিএম কাউন্টারের সংখ্যা দু’হাজারের বেশি। অধিকাংশতেই নিরাপত্তারক্ষী নেই। কখনও সেগুলির ভিতরে ভবঘুরে, আবার কখনও কুকুর ঢুকে যায়। পুলিশের বিরুদ্ধেও ঢিলেঢালা নিরাপত্তার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ, রাতে পুলিশ সেভাবে পেট্রোলিং করছে না বলেই এমন ঘটনা ঘটছে।
শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটের ডিসিপি (পশ্চিম) বিশ্বচাঁদ ঠাকুর বলেন, “রাতে শহরে পেট্রোলিং বাড়ানো হয়েছে। নজরদারিতে আমাদের কোনও গাফিলতি নেই। এটিএম কাউন্টারগুলিতে নিরাপত্তারক্ষী রাখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কের। তবে আমরা এই বিষয়ে ব্যাঙ্কগুলির সঙ্গে আবার আলোচনায় বসব।”
ডিসিপি (পূর্ব) রাকেশ সিং বলেন, “ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার বলার পরেও তারা সার্ভেল্যান্স বাড়াচ্ছে না। শহরে এত এটিএম, সব এটিএমের জন্য পুলিশ মোতায়েন সম্ভব না। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে অ্যালার্ম সিস্টেম, সিসি ক্যামেরা ও রাতে অন্তত নিরাপত্তারক্ষী রাখতে বলা হবে। ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে বলা হবে।”
সব মিলিয়ে, এটিএম নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে ব্যাঙ্ক এবং পুলিশ একে অপরের উপর দায় চাপাচ্ছে। এর মধ্যে প্রশ্নটা উঠছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েই। এই দড়ি টানাটানিতে কবে এটিএম কাউন্টারগুলো সত্যিই সুরক্ষিত হবে, সেটাই এখন দেখার।