কাশ্মীরে কোণঠাসা জঙ্গিরা, এবার বাংলা হয়ে ছক ‘স্লিপার সেল’-এর জাল বিস্তারের!

পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার যোগ্য জবাব দিয়েছে ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মাধ্যমে। পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের ৯টি জঙ্গিঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক মহলে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে একাধিক জঙ্গি সংগঠন। এই পরিস্থিতিতে নতুন কৌশল নিচ্ছে তারা: ভারতের মাটিতে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে ‘স্লিপার সেল’-এর জাল বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে খবর।

এক ছাতার তলায় জঙ্গিরা: মদত দিচ্ছে ISI
গোয়েন্দারা জানাচ্ছেন, গত কয়েক মাস ধরেই জঙ্গি সংগঠনগুলি একজোট হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য একটাই—এক ছাতার তলায় এসে ভারতে জঙ্গি কার্যকলাপ বৃদ্ধি করা। এই কাজে তাদের মদত দিচ্ছে পাকিস্তানের ISI এবং জামাত-উল-মুজাহিদিন (JMB), আন্সারুল্লাহর মতো একাধিক সংগঠন।

সম্প্রতি রাজ্য গোয়েন্দাদের হাতে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ২০১৯ সালে ভারত সরকার তেহরিক-উল-মুজাহিদিন নামে যে জঙ্গি সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল, সেই সংগঠনটি গোপনে নিজেদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। মাস কয়েক আগে এই নিষিদ্ধ সংগঠনের এক ‘স্লিপার সেল’ সদস্য পশ্চিমবঙ্গে আসে। কলকাতা এবং শহরতলির বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে সে যুব সমাজের একাংশের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। তাদের মগজধোলাই করে স্থানীয় সরকারের বিরুদ্ধে উস্কানি দেওয়ার কাজও শুরু করে। গোয়েন্দারা জেনেছেন, যুব সমাজের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে যেভাবে বিভিন্ন আন্দোলন দানা বাঁধে, ঠিক একই কায়দায় এখানেও আন্দোলনের ছক কষেছিল এই জঙ্গি সদস্য।

জাভেদ মুন্সি: ‘IED’-এ দক্ষ, কাসভের আদলে প্রশিক্ষণ?
এই মগজধোলাইয়ের প্রক্রিয়ার মধ্যেই কৌশলে যুবকদের জঙ্গি সংগঠনগুলির প্রয়োজনীয়তা বোঝানো হত। সরকার নিষিদ্ধ করলেও কেন এই সংগঠনগুলি দরকার, সেই বিষয়ে তাদের প্ররোচনা দেওয়া হত। পাশাপাশি, পশ্চিমবঙ্গে লুকিয়ে থাকা বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের ‘স্লিপার সেল’ সদস্যদের চাঙ্গা রাখার দায়িত্বও ছিল তেহরিক-উল-মুজাহিদিনের ওই সদস্যের কাঁধে। এই কাজের সূত্রেই সে দেখা করেছিল জাভেদ মুন্সির সঙ্গে। কারণ, পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বাংলাদেশের কায়দায় আন্দোলন তৈরির মূল দায়িত্ব ছিল এই জাভেদের উপরই।

কে এই জাভেদ মুন্সি? গোয়েন্দাদের জেরায় জানা গেছে, জাভেদ আদতে জম্মু ও কাশ্মীরের বাসিন্দা। মাস কয়েক আগে সে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিংয়ে আশ্রয় নেয়। সেখান থেকেই রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF) তাকে গ্রেফতার করে। জেরায় জাভেদ স্বীকার করেছে যে ক্যানিং থেকে সুন্দরবন হয়ে বাংলাদেশে পালানোর ছক কষেছিল সে। কিন্তু STF-এর জালে ধরা পড়ে আপাতত তার ঠিকানা প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগার।

গোয়েন্দাদের হাতে এসেছে আরও বিস্ফোরক তথ্য। জাভেদ ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (IED) তৈরিতে অত্যন্ত দক্ষ। পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে গিয়ে সে এই বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছে। সেখানে হাফিজ সঈদের ছেলে তালহা সঈদ-সহ একাধিক জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। তালহা পাক অধিকৃত কাশ্মীরে জঙ্গি কার্যকলাপের নেতৃত্ব দেয়।

সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, মুম্বই হামলার অন্যতম অভিযুক্ত আজমল কাসভকে যেভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল, জাভেদের প্রশিক্ষণের সঙ্গে তার বেশ মিল রয়েছে। এর ফলে গোয়েন্দারা জানতে চাইছেন, এই ধরনের প্রশিক্ষণ অন্য কেউ পেয়েছে কি না। জাভেদকে জেরা করলে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে বলেই মনে করছেন গোয়েন্দারা, তাই তাকে সম্প্রতি একাধিকবার জেরা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলিও জাভেদকে জেরা করে তার বয়ান রেকর্ড করেছে।

জাল নথি তৈরি থেকে বিদেশ যাত্রা: জাভেদের নেটওয়ার্কের বিস্তার
জাভেদের নেটওয়ার্ক শুধু রাজ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সারা দেশে বিস্তৃত। তার থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কেউ দেশের মধ্যে ‘স্লিপার সেল’ হিসেবে কাজ করছে, আবার কেউ বিদেশেও চলে গেছে। এখানেই শেষ নয়, জাভেদ বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষকে গোপনে ভারতে নিয়ে আসার কাজও করেছে। এখানে তাদের জন্য ভারতীয় জাল নথি এবং পাকিস্তানের জাল পাসপোর্ট তৈরি করে নেপাল হয়ে পাকিস্তানে পাঠানোর ব্যবস্থা করত সে।

গোয়েন্দারা এখন জানতে চাইছেন, জাভেদের থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ‘স্লিপার সেল’ সদস্যরা দেশের কোথায় কোথায় লুকিয়ে আছে? কারা বিদেশে গেছে এবং কেন তাদের সেখানে পাঠানো হয়েছে? সরকারের বিরুদ্ধে উস্কানি দিতে যাদের মগজধোলাই করা হয়েছে, তারাই বা কারা? এই সব প্রশ্নের উত্তর পেলেই জাভেদের মাধ্যমে জঙ্গি নেটওয়ার্কের পুরো ছবিটা পরিষ্কার হবে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।