খিদিরপুর অগ্নিকাণ্ড, মেয়র-মেয়র পারিষদের পরস্পরবিরোধী বয়ান, প্রশ্নের মুখে দমকলের ভূমিকা ও রহস্য

খিদিরপুরের অরফ্যানগঞ্জ বাজারে বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডের পর বাজারের প্রায় ১৩০০ দোকান ভস্মীভূত হয়ে গেছে। প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এই catastrophic ঘটনার পর কলকাতা পুরসভার মেয়র ফিরহাদ হাকিম এবং মেয়র পারিষদ তারক সিংয়ের মুখে সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর শোনা যাওয়ায় নতুন করে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। এর ফলে দমকলের ভূমিকা এবং আধুনিক অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
মেয়র ও মেয়র পারিষদের দ্বৈত বয়ান
মেয়র ফিরহাদ হাকিম দাবি করেছেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় বাজারে পাম্পিংয়ের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় দমকলের জল তুলতে অনেক দেরি হয়ে যায়, যা আগুনকে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে সাহায্য করে। তিনি বলেন, “এটি ছিল অসংগঠিত একটি বাজার। যানজটে দমকল ঢুকতে পারছিল না।” এরপরই তিনি জোর দিয়ে বলেন, “ওখানে কোনো পাম্পিংয়েরও ব্যবস্থা ছিল না। সুবিধা ছিল যে, পিছনেই আদি গঙ্গা। তবে জল তুলতে তুলতে অনেক দেরি হয়ে গেল। ভিতরে ঢোকা, প্ল্যান করা, কোথায় বাজার, সবটা জানতে সময় লেগে যায়।”
তবে, মেয়রের এই ব্যাখ্যার সম্পূর্ণ বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন পুরনিগমের মেয়র পারিষদ তারক সিং। বর্তমানে নিকাশি বিভাগের দায়িত্বে থাকলেও, তিনি পূর্বে বাজার বিভাগের মেয়র পারিষদ ছিলেন। তাঁর দাবি, অরফ্যানগঞ্জ বাজারে অনেক আগেই মুখ্যমন্ত্রীর বরাদ্দ করা টাকায় দমকলে জল ভরার জন্য অত্যাধুনিক ‘টুইন সকেট’ বসানো হয়েছিল। তারক সিংয়ের এই দাবিই এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে।
‘টুইন সকেট’ রহস্য ও অভিযোগের পাহাড়
তারক সিং জানান, “আমি যখন বাজার বিভাগের দায়িত্বে ছিলাম, তখন শহরে বেশ কয়েকটি বাজারে আগুন লেগেছিল। হাতিবাগান বাজার, নন্দারাম মার্কেট, সূর্য সেন বাজার, অরফ্যানগঞ্জ বাজার। এর পরেই সেখানে জলাধার তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়। বলা হয়েছিল, জলাধার না করা পর্যন্ত বাজার শুরু করা যাবে না। কিন্তু জায়গা না থাকায় আমি বিকল্প পথ বের করি।”
তিনি আরও দাবি করেন, “কলকাতার ৯৬টি জায়গায় অত্যাধুনিক টুইন সকেট লাগাই। যার জন্য কোনো বিশেষ জায়গার প্রয়োজন নেই। জলের সোর্স মাত্র তিন মিনিটে একটি গোটা দমকলের ইঞ্জিন ভর্তি করে দেবে। একটি সকেটের মাধ্যমে একসঙ্গে দুটি দমকলে জল ভর্তির কাজ করা যাবে। মুখ্যমন্ত্রী নয়টি জায়গার জন্য অর্থ দিয়েছিলেন। এই অরফ্যানগঞ্জেও একটি বসানো হয়। শহরের কোথায় কোথায় এই টুইন সকেট বসানো হয়েছে, তার মানচিত্র কলকাতা পুরনিগম ও দমকলের কাছে আছে।”
প্রশ্নচিহ্নের মুখে প্রশাসন
তারক সিংয়ের এই দাবি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে: যদি সত্যিই অত্যাধুনিক টুইন সকেট লাগানো থাকে, তাহলে স্বয়ং মেয়র কেন পাম্পিং ব্যবস্থার অভাবের কথা বলছেন? যদি তারক সিংয়ের কথা সত্য হয়, তাহলে কি দমকল কর্তৃপক্ষ এই টুইন সকেটের অবস্থান সম্পর্কে অবগত ছিল না? অথচ তারক সিং এটাও দাবি করেছেন যে, পুরনিগম ও দমকল উভয়ের কাছেই এই সকেটগুলির মানচিত্র বিদ্যমান।
এদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত দোকানদাররা প্রথম থেকেই দমকলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, এই অগ্নিকাণ্ডের পিছনে কোনো ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। যদিও প্রশাসন সকল অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে, মেয়র ও মেয়র পারিষদের এই পরস্পরবিরোধী মন্তব্যগুলো জনমনে আরও সংশয় তৈরি করেছে।
কী এই ‘টুইন সকেট’?
‘টুইন সকেট’ হল অত্যাধুনিক গভীর নলকূপ, যার মাথায় দুটি সকেট লাগানো থাকে। দমকলের পাইপ এই সকেটে লাগিয়ে দিলে মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে একটি বড় দমকলের ইঞ্জিন জল ভর্তি হয়ে যায়। একইসাথে দুটি সকেটের মাধ্যমে দুটি দমকলের ইঞ্জিন ভর্তি করা সম্ভব।
জানা গেছে, বড় ধরনের আগুন মোকাবিলায় জলের যোগানের অভাবে দমকলের গাড়িকে যেন বেগ পেতে না হয়, সেজন্য কয়েক বছর আগেই এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কলকাতার বুকে ৯৬টি জায়গায় বসানো হয়েছিল। হাতিবাগান, নিউমার্কেট, অরফ্যানগঞ্জ-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এই জরুরি জলের উৎস স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এত আধুনিক ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কেন খিদিরপুরের অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় দমকলকে হিমশিম খেতে হল, এবং কেনই বা স্বয়ং মেয়র পাম্পিং ব্যবস্থার অভাবের কথা বললেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
এই বিতর্কের আবহে আগুনের গ্রাসে সর্বস্বান্ত হওয়া ক্ষুব্ধ দোকানদারদের ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা আরও জোরালো হচ্ছে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং দ্রুত তদন্তের দাবি ক্রমেই বাড়ছে।