“রিকশায় বিচারক, কাঠগড়ায় রাজ্য সরকার”-বিচার ব্যবস্থার বেহাল দশায় নজিরবিহীন ছবি!

ভিড়ে ঠাসা আদালত চত্বর। মেন গেট থেকে বিচারকের এজলাস পর্যন্ত এলাকায় বহু মানুষের আনাগোনা। হঠাৎই এক পুলিশকর্মীর হাঁকডাক, “সরে যান, সরে যান! স্যার আসছেন।” এই পর্যন্ত সব স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু পরমুহূর্তেই যা দেখা গেল, তাতে ভিড় শুধু হতবাকই নয়, রীতিমতো স্তম্ভিত। একটি হাতে-টানা রিকশায় বসে এক রাশভারী ব্যক্তি আদালত চত্বরে প্রবেশ করছেন, আর সেই রিকশার সামনে দিয়ে এসকর্ট করে চলেছেন ওই পুলিশকর্মী!

কে এই ‘ভিআইপি’ যিনি রিকশায় চেপে আদালতে? ভিআইপি হলে তাঁর ঝলমলে গাড়ি কোথায়? এই প্রশ্নগুলোই ঘুরপাক খাচ্ছিল উপস্থিত জনতার মনে। খোঁজ নিতে গিয়ে উঠে এল এক ভয়ঙ্কর তথ্য: রিকশার আরোহী আর কেউ নন, তিনি ওই আদালতেরই একজন বিচারক! আদালত থেকে কিছুটা দূরেই তাঁর সরকারি আবাস, কিন্তু সেদিন গাড়ি না পেয়ে উপায়ন্তর না দেখে রিকশাতেই এসেছেন তিনি।

কেন মিলছে না গাড়ি? পাহাড় প্রমাণ বকেয়ার বোঝা
কিন্তু কেন গাড়ি পেলেন না বিচারক? জানা গেছে, যে ব্যক্তি বা সংস্থা বিচারককে গাড়ি ভাড়া দেন, রাজ্য সরকারের কাছে তাঁদের লক্ষ লক্ষ টাকা বকেয়া পড়ে রয়েছে। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে বকেয়া বাড়তে বাড়তে এখন পাহাড় প্রমাণ। ওই গাড়ি ভাড়া দেওয়া ব্যক্তিরা আর পকেট থেকে জ্বালানির টাকা বা চালকের বেতন দিতে পারছেন না।

সাম্প্রতিক অতীতে দক্ষিণবঙ্গের এক জেলা আদালতের এই নজিরবিহীন ঘটনা সরকারিভাবে স্বীকার করা হয়নি বটে, তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে এটি প্রকাশ্যে এসেছে। আরও জানা যায়, কিছুদিন আগে একই কারণে দুর্গাপুরের বিচারকেরাও দল বেঁধে হেঁটে আদালতে যান— সেই বিষয়টিও প্রকাশ পেয়েছে।

এতদিন জেলা আদালতের বিচারকেরা মূলত ভাড়ার গাড়ি ব্যবহার করতেন। জেলার কোনও ব্যবসায়ী এই গাড়ি সরবরাহ করতেন এবং তিনিই চালক ও জ্বালানির খরচ বহন করতেন। পরে সরকারের কাছে বিল জমা দিয়ে সেই টাকা ফেরত নিতেন। কিন্তু অভিযোগ, গত বেশ কয়েক বছর ধরে এই বকেয়ার পরিমাণ ক্রমবর্ধমান। সূত্রের খবর, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা আদালতে ভাড়া গাড়ির টাকা ২০২২ সাল থেকে বকেয়া, যার পরিমাণ প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা। হুগলি জেলাতে গাড়ির বিল বাবদ ৫০ থেকে ৫৫ লাখ টাকা বাকি। কোনও জেলায় বকেয়া ১০ লক্ষ টাকায় পৌঁছলে কিছু টাকা (এক-দু’লক্ষ) শোধ করা হলেও, বাকিটা আবার বকেয়া থেকে যাচ্ছে।

নিজের গাড়িই ভরসা, তবুও খরচ নিয়ে টানাপোড়েন
জানা গেছে, রাজ্যের প্রায় ১৪০০ জেলা বিচারকের মধ্যে ৯৫ শতাংশই এখন নিজেদের গাড়ি ব্যবহার করছেন। জুনের পর থেকে নাকি সব বিচারককেই নিজেদের গাড়ি ব্যবহার করতে হবে বলে জানানো হয়েছে। এই বাবদ বেতনের সঙ্গে অতিরিক্ত ১৩,৫০০ টাকা পাবেন তাঁরা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট পেট্রল পাম্পে গিয়ে সই করে গাড়ির তেল তুলতে হয়, ফলে বিচারকদের পকেট থেকে সরাসরি টাকা যায় না। কিন্তু সমস্যা হলো, এই পেট্রল পাম্প মালিকদের টাকাও বকেয়া পড়ে যাচ্ছে!

কলকাতায় কর্মরত বিচারকেরা মাসে ১০০ লিটার এবং জেলায় কর্মরত বিচারকেরা ৭৫ লিটার তেল পান। জেলার প্রধান বিচারকের (জেলা জজ) কাছে এই পেট্রল পাম্পের বিল জমা পড়ে। জেলার এক বিচারবিভাগীয় প্রশাসকের কথায়, “বিল এলে তা অ্যাকাউন্ট্যান্টের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। জমা হতে থাকে সেই বিল। কখনও রাজ্য থেকে কিছু টাকা স্যাংশন হলে তা দিয়ে কিছু বকেয়া মিটিয়ে দেওয়া হয়। আবার যে কে সেই।”

কেন এই আর্থিক সংকট? সরকারি বরাদ্দের অসঙ্গতি ফাঁস
এই আর্থিক সংকটের মূল কারণ কোথায়? হিসাব বলছে, গত ১০ বছরে বিচার ব্যবস্থার জন্য রাজ্য বাজেটে বরাদ্দ প্রায় তিন গুণ বাড়লেও, তা পর্যাপ্ত নয়। ২০১৪-১৫ অর্থবর্ষে যেখানে বরাদ্দ ছিল ২৪ কোটি টাকা, সেখানে ২০২২-২৩-এ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, তথ্য জানার অধিকার (RTI) আইনে সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে হাইকোর্টে রাজ্যের প্যানেলের আইনজীবীদের ফি বাবদ প্রায় ৪২ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। চলতি বছরে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের প্যানেলের আইনজীবীদের প্রায় ৬০ কোটি টাকা মেটানোর একটি তালিকা কয়েকদিন আগেই প্রকাশ্যে এসেছে। শুধু হাইকোর্টই নয়, নিম্ন আদালতেও রাজ্যের প্যানেলভুক্ত আইনজীবীদের ফি বাবদ ২০২৩ সালে প্রায় ৩১ কোটি টাকা মেটানো হয়েছে বলে খবর।

বিচারবিভাগীয় প্রশাসকদের অভিযোগ, রাজ্য সরকারের হয়ে মামলা লড়ার জন্য বছরে যে টাকা খরচ হচ্ছে, গোটা রাজ্যের বিচার ব্যবস্থা চালানোর জন্য বরাদ্দ তার থেকে কম! এর উপরে কাগজে-কলমে যতটা বরাদ্দ হচ্ছে, বাস্তবে তা পাওয়া যাচ্ছে না, যার ফলে নিম্ন আদালতগুলির দুরবস্থা চরমে। তাঁদের হাতে আর্থিক ক্ষমতা (Financial Power) নেই বলেও অভিযোগ তুলেছেন বিচারবিভাগীয় প্রশাসকেরা। এই ক্ষমতা জেলার ডিএম-এসপি-দের হাতে থাকে, তাই তাঁদের গাড়ির বিল বা অন্যান্য খরচ বকেয়া থাকে না। টাকার অভাব শুধু আদালতেরই! শুধু গাড়ির বিল নয়, জেলা আদালতের মাথার উপরে রয়েছে আরও বহুবিধ দেনা।

তথ্যসূত্র:এই সময়