মেটাভার্সেও নিরাপদ নন নারীরা, যৌন হয়রানির ভার্চুয়াল রূপ নিয়ে বিতর্ক

বাস্তব জগতের মতো ভার্চুয়াল জগতেও নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন, যা এক উদ্বেগজনক নতুন চিত্র তুলে ধরেছে। মেটাভার্সে যৌন সহিংসতা এতটাই সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, অনেক ব্যবহারকারীই এটিকে ‘নিয়মিত ঘটনা’ হিসেবেই বিবেচনা করছেন। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

ব্রিটিশ লেখিকা ও গবেষিকা লরা বেটস মেটাভার্সে প্রবেশ করার মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই প্রত্যক্ষ করেন যে, একজন নারী ব্যবহারকারীর অ্যাভাটার যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। ভুক্তভোগী নারী বলেন, “সে এসে আমার পেছনে হাত দিয়েছে।” আশপাশে থাকা আরও কয়েকজন নারী একই সুরে বলেন, “এটাতো নিত্যদিনের ঘটনা।”

মেটা নির্মিত এই ভার্চুয়াল জগতে থ্রিডি অডিও, হ্যাপটিক ফিডব্যাক এবং মোশন ট্র্যাকিংয়ের মতো প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতাকে বাস্তবের মতো করে তোলে। কিন্তু যখন এই অভিজ্ঞতা হয়রানির হয়, তখন তা আরও ভয়াবহভাবে মানসিকভাবে প্রভাব ফেলে। লরা বেটস মেটাভার্সে থাকা অবস্থায় একটি বোর্ডে লেখেন, “আপনি কি মেটাভার্সে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন?” তাৎক্ষণিকভাবে একাধিক নারী উত্তর দেন, “হ্যাঁ, অনেকবার”, “সবাই তো হয়রানির শিকার হয় এখানে।”

প্রতিবেদনে আরও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে: মেটাভার্সে অল্পবয়সী কিশোরীদের অ্যাভাটারকে লক্ষ্য করে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ব্যবহারকারীদের মাধ্যমে নিয়মিত যৌন টিটকারি ও অশোভন আচরণের শিকার হতে দেখা গেছে। এক ভার্চুয়াল ক্লাবে লেখিকা এমন কিছু শিশুকে মঞ্চে গান করতে দেখেন যাদের কণ্ঠ শুনে মনে হয় তারা নয় বা দশ বছর বয়সী। অথচ তাদের দিকে প্রকাশ্যে মন্তব্য ছুড়ছিলেন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষরা।

মডারেটরদের নিষ্ক্রিয়তা ও মেটার দায়বদ্ধতা:

২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনলাইন প্রকাশনা টেকক্রাঞ্চ এর এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মেটার ভার্চুয়াল জগতে ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা দিতে যেসব মডারেটর রয়েছেন, তারা হয়রানির ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখছেন না। একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “গত রাতে একজন আমাকে গোপনাঙ্গ স্পর্শ করেছে। আর আশপাশে থাকা অন্যান্যরা তাতে উৎসাহ দিয়েছে।”

এর জবাবে মেটার এক কর্মকর্তা বলেছিলেন, ব্যবহারকারী যদি সেইফটি টুল ব্যবহার করতেন, তাহলে হয়তো এমনটা হতো না। ভুক্তভোগীর ওপর ঘটনার দায়ভার চাপিয়ে দেওয়ার এই প্রবণতাই মেটার সমস্যার গভীরতা প্রকাশ করে।

বাস্তব জীবনের মতো ট্রমা:

যুক্তরাজ্যের পুলিশ ২০২৪ সালে ১৬ বছরের কম বয়সী এক কিশোরীর ভার্চুয়াল দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা তদন্ত করে। সেই তদন্তে উঠে আসে যে, মেয়েটির ওপর ওই ঘটনার মানসিক প্রভাব বাস্তব ধর্ষণের ট্রমার মতোই ছিল।

কাউন্টারিং ডিজিটাল হেইট (সিসিডিএইচ) এর গবেষণায় দেখা গেছে, মেটাভার্সে গড়ে প্রতি সাত মিনিটে একজন ব্যবহারকারী কোনো না কোনো ভাবে নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। সাড়ে ১১ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে ১০০টি সম্ভাব্য নিয়মভঙ্গের ঘটনা শনাক্ত হলেও, মেটা কোনো প্রতিবেদনেই সাড়া দেয়নি। এনএসপিসিসি (NSPCC) এর মতে, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অনলাইন গ্রুমিংয়ের ৪৭ শতাংশ ঘটনাই ঘটেছে মেটার মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্ম যেমন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং হোয়াটসঅ্যাপে।

লরা বেটস প্রশ্ন রেখেছেন, যদি আজকের ভার্চুয়াল জগতে মেয়েরা নিরাপদ না হন, তাহলে ভবিষ্যতের অফিস, ক্লাসরুম কিংবা স্বাস্থ্যসেবার ভার্চুয়াল সংস্করণেও তারা কি একইরকম হয়রানির শিকার হবেন? তাহলে তো মেটাভার্সের সঙ্গে সঙ্গে লিঙ্গ বৈষম্যও ডিজিটালি স্থায়ী রূপ পাচ্ছে।

এদিকে এ বিষয়ে মেটার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো জবাব মেলেনি, যা এই গুরুতর অভিযোগগুলিকে আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করছে। মেটাভার্সের এই অন্ধকার দিকটি ডিজিটাল ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ও নৈতিকতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।