ওজনে কারচুপি! সাধারণ ‘খাজা’কে মহাপ্রসাদ বলে ঠকানোর অভিযোগ, পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের রহস্য ফাঁস

পুরীর জগন্নাথ ধাম—শুধু একটি তীর্থক্ষেত্র নয়, কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাস আর আবেগের কেন্দ্রবিন্দু। শ্রীক্ষেত্রের মহাপ্রসাদ যেন অমৃততুল্য, যা পাওয়ার জন্য ভক্তরা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন। সেই পবিত্র ‘মহাপ্রসাদ’-এর নামেই চলছে নির্লজ্জ ব্যবসা! ওড়িশাটিভির এক বিস্ফোরক প্রতিবেদনে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

পুরীর মন্দির চত্বরে নাকি রমরমিয়ে চলছে ভেজাল আর ওজনে কারচুপি করা ‘খাজা’ বিক্রির কারবার। শুধু তাই নয়, অভিযোগ উঠেছে—কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সাধারণ ‘খাজা’কেই ‘মহাপ্রসাদ’ বলে দেদার বিক্রি করছেন! ভক্ত এবং সেবায়েতদের একাংশের অভিযোগ, মন্দিরে আসা সরল বিশ্বাসী মানুষদের ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে একটি দুষ্টচক্র সক্রিয় হয়েছে। এই চক্র সাধারণ খাজা বা গজাকে মিথ্যে ‘মহাপ্রসাদ’-এর তকমা সেঁটে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা টাকা।

বেরহামপুরের একদল তীর্থযাত্রীর তিক্ত অভিজ্ঞতা যেন এই অন্যায় ব্যবসার জ্বলন্ত প্রমাণ। অভিযোগ, জগন্নাথ মন্দিরের কাছে একটি দোকান থেকে ২০ কেজির দাম নিয়ে তাঁদের ধরিয়ে দেওয়া হয় মাত্র ১২ কেজি খাজা! সন্দেহ হওয়ায় কাছেই অন্য একটি দোকানে মেপে তাঁরা বুঝতে পারেন, কী ভয়ানক প্রতারণার শিকার হয়েছেন। প্রতিবাদ করলে, স্থানীয় গুণ্ডাদের ভয় দেখানোর অভিযোগও উঠেছে ওই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে। এমনকি, পর্যটকদের অশ্রাব্য গালিগালাজ ও ভয় দেখানোর চেষ্টাও করা হয় বলে জানা গিয়েছে।

আরও মারাত্মক অভিযোগ, মন্দিরের বাইরের কিছু বিক্রেতা নাকি ‘মহাপ্রসাদ’ বিক্রির মিথ্যা দাবি করে প্রতি কেজিতে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দাম হাঁকছেন! তাঁদের বিক্রি করা নিম্নমানের, সম্ভবত অস্বাস্থ্যকর ‘খাজা’কেই ‘মহাপ্রসাদ’ বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভক্তদের অভিযোগ, এতে তাঁদের ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম আঘাত লাগছে। রাস্তার ধারের দোকান থেকে ঠেলাগাড়ি পর্যন্ত—এই প্রতারণামূলক ব্যবসা অবাধে চলছে বলে অভিযোগ। মিষ্টির উপাদান এবং তৈরির পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন শ্রীমন্দিরের একাংশ সেবায়েতও। তাঁদের স্পষ্ট দাবি, ‘খাজা’কে ‘মহাপ্রসাদ’ বলে বিক্রি করার এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া উচিত। পুরীর ‘খাজা’-র মান বজায় রাখতে এর জিআই ট্যাগ দেওয়ার কথাও বলছেন তাঁরা। সেবায়েত কৃষ্ণ চন্দ্র খুন্তিয়ার মতে, প্রশাসনের উচিত ভক্তদের সচেতন করা—মন্দিরের বাইরে যা বিক্রি হচ্ছে, তা ‘মহাপ্রসাদ’ নয়, ওটা পুরীর একটি জনপ্রিয় মিষ্টিমাত্র।

অবশেষে, প্রতারিত ভক্তরা সিংহদ্বার থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন। এর ভিত্তিতে সন্তোষ পান্ডা নামে এক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে পুলিশ। ওড়িশাটিভির খবর অনুযায়ী, পুরীর সাব-কালেক্টর ইতিমধ্যেই এই প্রতারক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। Food Safety and Weights & Measures Department-কে নিয়ে একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছে, যারা এই অভিযোগগুলির তদন্ত করবে। সামনেই রথযাত্রা, যখন সারা বিশ্ব থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্ত সমাগম হয় পুরীতে। প্রশাসন তাই চাইছে, এই সময় যেন কোনও ভক্ত প্রতারিত না হন।

এখন দেখার, প্রশাসনের এই তৎপরতা শ্রীক্ষেত্রে ‘মহাপ্রসাদ’-এর নামে চলা এই অনৈতিক কারবার বন্ধ করতে কতটা সক্ষম হয়। ভক্তরা চান, তাঁদের বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা হোক, আর ‘মহাপ্রসাদ’-এর পবিত্রতা যেন অক্ষুণ্ণ থাকে।