জলের তলায় মণিপুর! চার দিনের বৃষ্টিতে ঘর ছাড়া প্রায় ১৯০০০

ঈশ্বরের আপন দেশ যেন আজ জলের বন্দিশালা। গত চার দিনের অঝোর বৃষ্টিতে মণিপুরে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। নদীর জল উপচে আর বাঁধ ভেঙে প্লাবিত বিস্তীর্ণ এলাকা, যার জেরে ১৯ হাজারের বেশি মানুষ আজ অসহায়। সোমবার সরকারি সূত্রে খবর, ইতিমধ্যেই ৩,৩৬৫টি বাড়ি জলের তলায়, আর ১৯,৮১১ জন মানুষ এই দুর্যোগের শিকার। ঘরছাড়া মানুষদের জন্য ইম্ফল ইস্ট জেলায় খোলা হয়েছে ৩১টি ত্রাণ শিবির।
ইম্ফল, নম্বুল এবং ইরিল নদীর জল গত চারদিনের টানা বৃষ্টিতে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। খুরাই, হেইঙ্গাং, চেকনের মতো এলাকায় বাঁধ ভেঙে বন্যার জল ঢুকে পড়েছে লোকালয়ে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইম্ফল ইস্ট জেলা।
ওয়াংখেই, হেইঙ্গাং, লামলং, খুরাই, জেএনআইএমএস এবং আহাল্লুপের মতো এলাকাগুলো এখন জলমগ্ন। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ৪৭টি ভূমিধসের ঘটনা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।
পোরেম্পাটের জওহরলাল নেহরু ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস (জেএনআইএমএস)-এর নিচতলায় জল ঢুকে যাওয়ায় রবিবার সন্ধ্যায় মহিলা অর্থোপেডিক ও সার্জারি ওয়ার্ডের রোগীদের অন্যত্র সরানো হয়েছে। স্থানীয় ক্লাব, স্বেচ্ছাসেবক, এসডিআরএফ এবং এনডিআরএফ কর্মীরা একযোগে এই কাজে সাহায্য করছেন।
মণিপুরের রাজ্যপাল অজয় কুমার ভাল্লা নিজে ইম্ফল শহরের জলমগ্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। মুখ্যসচিব পি.কে. সিং এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাংলা নংপোক থং, লাইরিক্যেঙ্গবাম লেইকাই এবং সিংজামেই ব্রিজ ঘুরে দেখেছেন এবং সামগ্রিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন করেছেন।
ইতিমধ্যেই ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং আসাম রাইফেলস ইম্ফল ইস্ট জেলার জলমগ্ন এলাকা থেকে প্রায় ৮০০ জনকে উদ্ধার করেছে, যাদের মধ্যে বিশেষভাবে সক্ষম ও বয়স্ক মানুষও রয়েছেন। পোরোমপাট, ওয়াংখেই, সানজেনথং, প্যালেস কম্পাউন্ড, নিউ চেকন, খুরাই, হেইক্রুমাখং, সোইবাম লেইকাই, ওয়াংখেই আঙ্গোম লেইকাই এবং নংমেইবুং রাজ বাড়ি এলাকায় আসাম রাইফেলসের উদ্ধারকারী দল মোতায়েন রয়েছে।
সেনাবাহিনী ও আসাম রাইফেলসের ১০টি বন্যা ত্রাণকারী দল বোট নিয়ে ইম্ফল ইস্ট ও ওয়েস্টে উদ্ধার কাজ চালাচ্ছে। ইরিল নদীর ভাঙা বাঁধ মেরামতের কাজও চলছে জোরকদমে, যাতে আর নতুন করে বন্যা না হয়। এই অভিযানে প্রায় ৫০০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
মণিপুরের রাজধানী ইম্ফল এবং ইম্ফল ইস্ট জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন জলের তলায়। চেকন এলাকায় ইম্ফল নদী উপচে পড়ায় অল ইন্ডিয়া রেডিও ইম্ফল কমপ্লেক্স সহ বহু সরকারি দফতর, স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং প্রতিষ্ঠানে জল জমে গেছে।
লোকসভার সাংসদ আঙ্গোমচা বিমল আকোইজাম রাজ্যপাল অজয় কুমার ভাল্লার কাছে এই বন্যাকে ‘রাজ্য বিপর্যয়’ ঘোষণার আবেদন জানিয়েছেন, যাতে আরও দ্রুত ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু করা যায়। বন্যার কারণে ইম্ফল ইস্ট, ইম্ফল ওয়েস্ট এবং সেনাপতি জেলার সেনাপতি মহকুমায় স্কুলগুলির গ্রীষ্মকালীন ছুটি আরও বাড়ানো হয়েছে। রাজ্যপাল পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই জেলাগুলির সমস্ত সরকারি, সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত এবং বেসরকারি স্কুলের ছুটি বৃদ্ধির নির্দেশ দিয়েছেন।
মণিপুর পুলিশ, এসডিআরএফ, এনডিআরএফ, মণিপুর ফায়ার সার্ভিস, আসাম রাইফেলস এবং সেনাবাহিনী স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দিনরাত কাজ করছে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বাঁধ মজবুত করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে আর কোনও ক্ষয়ক্ষতি না হয়।
আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, রবিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত গত তিন ঘণ্টায় মাঝারি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। কাংপোকপি জেলার সাইকুল এলাকায় ১৬ মিমি, নোনি জেলার খৌপুমে ২৪ মিমি এবং ইম্ফল ওয়েস্ট জেলায় ১৫ মিমি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এই এলাকাগুলি ইম্ফল শহরে প্রবাহিত নদীগুলির জলধারণকারী অঞ্চল।
বন্যার কারণে ইম্ফল উপত্যকায় প্রায় ৪,০০০ মানুষ বাস্তুচ্যুত। কোহিমার কাছে জাতীয় সড়ক-২ ধসে যাওয়ায় ভারী যান চলাচল বন্ধ। স্থানীয় মানুষজন এবং কর্তৃপক্ষ ইরিল নদীর বাঁধ মেরামতের চেষ্টা চালাচ্ছেন, যদিও খুরাই ও হেইঙ্গাং এলাকার পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক।
এই বন্যা মণিপুরের জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। রাস্তাঘাট জলমগ্ন, ভেঙে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য সরকার ও স্থানীয় মানুষ একযোগে কাজ করছেন, যাতে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবিলা করা যায়।