আলো নিভেও জ্বলে জ্ঞানের মশাল! অধ্যাপক লাল দৃষ্টিহীন হয়েও ছুঁয়েছেন সাফল্যের আকাশ, পড়ুন জীবনকাহিনী

ঝাড়খণ্ডের রাজধানী রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক, যাঁর জীবন হার মানায় সিনেমার গল্পকেও। অধ্যাপক মোহিত লাল, যাঁর দু’চোখে আলো নেই, কিন্তু হৃদয়ে রয়েছে অসীম সাহস আর দৃঢ় সংকল্প। তিনি শুধু তাঁর ছাত্রদের নন, সকলের জন্যই এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণার উৎস। যেখানে বহু মানুষ শারীরিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জীবনে বিশেষ কিছু অর্জন করতে পারেন না, সেখানে অধ্যাপক লাল দৃষ্টিহীন হয়েও ছুঁয়েছেন সাফল্যের আকাশ, অর্জন করেছেন একের পর এক ডিগ্রি, আর আজ তিনি আধুনিক ইতিহাসের এক অত্যন্ত জনপ্রিয় অধ্যাপক।
জন্মের সময় স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি থাকলেও, অধ্যাপক লালের জীবন এক অপ্রত্যাশিত মোড় নেয়। তাঁর বাবা ছিলেন সরকারি কর্মচারী, বদলি হন হিমাচল প্রদেশে, আর সেখানেই ঘটে সেই মর্মান্তিক ঘটনা। রক্ত আমাশা, টাইফয়েড এবং ওষুধের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় মাত্র নয় বছর বয়সেই তিনি চিরতরে হারান তাঁর চোখের আলো।
অধ্যাপক লাল সেই কঠিন দিনগুলোর কথা স্মরণ করে বলেন, “বাবা আমাকে চার-পাঁচ বছর ধরে চিকিৎসা করিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৮১ সালে ডাক্তাররা যখন নিশ্চিত করলেন, আমি আর দেখতে পাব না, তখন আমি সেটাকেই আমার ভাগ্য বলে মেনে নিলাম। আর ঠিক করলাম, আমার জীবনের গল্পটা আমি নিজেই নতুন করে লিখব। সেই শুরু।”
অন্ধকারের সেই পথে মোহিত লাল আঁকড়ে ধরেন শিক্ষাকে। ভর্তি হন রাঁচির সেন্ট মাইকেল’স ব্লাইন্ড স্কুলে, শুরু হয় ব্রেইল লিপিতে পড়াশোনা। ১৯৮৫ সালে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করার পর, তিনি রাঁচির সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। এখানেই শেষ নয়, এরপর তিনি অর্জন করেন আইনের ডিগ্রি, পাশ করেন নেট, এবং অবশেষে ২০২১ সালে ইতিহাসে সম্পন্ন করেন পিএইচডি। ২০২১ সালে ধানবাদে শিক্ষকতা শুরু করার পর, ২০২২ সালে তিনি যোগ দেন রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর বিভাগে।
অধ্যাপক ড. মোহিত লালের একটি অসাধারণ গুণ হল তাঁর স্মৃতিশক্তি। তিনি যা একবার শোনেন, তা যেন গেঁথে যায় মস্তিষ্কে। ছাত্রছাত্রীরাও স্যারের এই ব্যতিক্রমী ক্ষমতার কথা অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করেন। তাদের কথায়, “স্যারের স্মৃতিশক্তি অবিশ্বাস্য! তিনি একবার শুনেই সব মনে রাখতে পারেন।”
দৃষ্টি হারানোর বেদনাকে জয় করে অধ্যাপক লাল বলেন, “আমি দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছি, কিন্তু সাহস আর দৃঢ়তা হারাইনি। আমি খুব ভালো করে জানি, জীবনে সবাই সবকিছু পায় না। কেউ জমি পায় তো আকাশ পায় না, আবার কেউ আকাশ পায় তো জমি পায় না। এমন পরিস্থিতিতে, যা পেয়েছি, তাকে ভালোভাবে ব্যবহার করে এগিয়ে যাওয়াই আসল। আমার যা নেই, তা নিয়ে কেন ভাবব? বরং আমার যা আছে, তাকে পূর্ণভাবে ব্যবহার করা উচিত।”
অধ্যাপক মোহিত লালের এই জীবনকাহিনী সত্যিই অনুপ্রেরণামূলক। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যে মনের জোর আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে তুচ্ছ, তা যেন তিনি নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন। জ্ঞানের আলোয় যিনি আলোকিত করেছেন বহু ছাত্রের জীবন, সেই অধ্যাপক মোহিত লালের প্রতি রইল আমাদের সশ্রদ্ধ অভিবাদন।