ঋতুপর্ণকে বাড়িতে আসতে মানা করেছিলেন প্রসেনজিৎ নিজেই_এর আসল কারণ কী?

‘চোখের বালি’র সেটে নাকি প্রায় রোজই লেগে থাকত পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ আর অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের তুমুল ঝগড়া! খোদ ঐশ্বর্য রাই বচ্চন পর্যন্ত নাকি একদিন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আপনারা দু’জনেই তো সুপারস্টার, সকাল থেকে এত ঝগড়া করেন কেন?” ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের ‘গৃহপ্রবেশ’-এর ট্রেলার ও পোস্টার লঞ্চ অনুষ্ঠানে এমনই সব ফেলে আসা দিনের গল্প উঠে এল প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণায়। ঋতুপর্ণ, যাঁর কাছে তিনি ছিলেন বন্ধু এবং অভিভাবকের মতো।

‘গৃহপ্রবেশ’-এর ঝলকানি অনুষ্ঠানে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়, জিতু কমল, সোহিনী সেনগুপ্ত, রুদ্রনীল ঘোষের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন আবির চট্টোপাধ্যায়, রাজ চক্রবর্তী, মহেন্দ্র সোনি-র মতো তারকারা। প্রসেনজিৎ বলেন, “ইন্দ্রদীপের এই ছবির ট্রেলারে যে ছবিগুলো টাঙানো আছে, সেগুলো দেখলে অনেক পুরনো বাংলা ছবির কথা মনে পড়ে যায়। এই ধরনের ছবি বাংলা সিনেমায় আরও বেশি করে দরকার।”

এরপর যখন ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রসঙ্গ উঠল, তখন যেন নস্টালজিয়ার এক অন্য জগৎ খুলে গেল। প্রসেনজিৎের কণ্ঠে ঝরল, “যে কোনও স্কুলে যেমন একজন খিটখিটে শিক্ষক, হেডমাস্টার বা প্রিন্সিপালের দরকার হয়, তেমনই বাংলা সিনেমাতেও একজন কড়া মাস্টারমশাইয়ের খুব প্রয়োজন ছিল। ঋতুপর্ণ ঠিক তেমনই একজন ‘খিটখিটে’ হেডমাস্টারের মতো ছিল।”

আশ্চর্য্য হলেও সত্যি, ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রয়াণের পর তাঁকে নিয়ে তেমন কথা বলতে শোনা যায়নি প্রসেনজিৎকে। এদিন মঞ্চে সে কথাও অকপটে স্বীকার করলেন ‘ইন্ডাস্ট্রি’। বললেন, “আমি সাধারণত ঋতুকে নিয়ে কিছু বলি না। ওটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত। সে একদিকে যেমন পরিচালক ছিল, তেমনই ছিল আমার বন্ধু। ঋতুকে নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। এক সময় ঋতু একটা গসিপ ম্যাগাজিনে কাজ করত। আমি ওকে স্পষ্ট বলেছিলাম, যতদিন তুই ওখানে কাজ করবি, আমার বাড়িতে আসবি না। কারণ তুই আমার বেডরুমে আসিস, রান্নাঘর থেকে খাবার খাস, আর তুই একটা গসিপ ম্যাগাজিনের সম্পাদক! এমনও হয়েছে, ঋতু আমার বাড়িতে এসেছে আর আমি ওর সামনে দিয়েই বেরিয়ে গেছি। ও আমার বউকে এটা ওটা রেঁধে দিতে বলত। এমনকি আমাদের মধ্যে দু’-আড়াই বছর কথাও বন্ধ ছিল।”

স্মৃতির ঝাঁপি খুলে প্রসেনজিৎ আরও বলেন, “আমরা টেলিভিশনেও একসঙ্গে কাজ করেছি। কত স্মৃতি! একদিন তো সেট থেকে সব জিনিসপত্র তুলে নিয়ে চলে গিয়েছিল। আমি গিয়ে বোঝাই, ‘ন্যাকামো করছিস?’ ছেলেগুলো কষ্ট করে কাজ করছে…” ‘গানের ওপারে’-র পর অর্জুন আর মিমিকে নিয়ে একটা ছবি করার সময় তাদের মধ্যে নাকি ঝগড়া ছিল। প্রসেনজিৎ ঋতুপর্ণকে বলেছিলেন, “তুই তো ওদের তৈরি করেছিস, ওরা একটা ছবি করছে, এসে আশীর্বাদ করে যা।” ঋতু নাকি সবার আগে কেক কাটতে ছুটে এসেছিলেন! এই ছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ।

‘গৃহপ্রবেশ’-এর মুখ্য অভিনেত্রী শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ও ঋতুপর্ণের সঙ্গে কাজ করতে না পারার আক্ষেপ প্রকাশ করেন। বলেন, “ঋতু দা’র সঙ্গে কাজ করতে না পারার আক্ষেপ আমার চিরকাল থেকে যাবে। যাঁর ছবিতে নারী চরিত্ররা এত মুখ্য হয়, তাঁকে খুব মিস করি।”

রাজ চক্রবর্তীও ঋতুপর্ণকে স্মরণ করে বলেন, “একবার ‘চ্যালেঞ্জ’ ছবির গান ‘কৃষ্ণ করলে লীলা আমরা করলে বিলা’ নিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছিলাম। হল থেকে শো বন্ধ হয়ে যায়। তখন আমি অন্য ছবির লোকেশন দেখতে যাচ্ছিলাম। ঋতু দা ফোন করে আমাকে বলেন, যারা গানটা নিয়ে অভিযোগ করছে, তাদের উচিত জবাব কী হবে। সেদিন উনি আমার সঙ্গে প্রায় আড়াই ঘণ্টা কথা বলেছিলেন। সেই দিনটা আমার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা ভাষায় বোঝানো কঠিন। উনি আমাকে বাড়িতে ডেকেও বুঝিয়েছিলেন। ঋতু দা যেদিন চলে গেলেন, সেদিন খুব বৃষ্টি হয়েছিল…”

ঝগড়া, অভিমান, ভালোবাসা আর গভীর বন্ধুত্ব – ঋতুপর্ণ ঘোষ আর প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সম্পর্ক ছিল এমনই। আর সেই সম্পর্কের টুকরোগুলি যেন এদিন ‘গৃহপ্রবেশ’-এর মঞ্চে জীবন্ত হয়ে উঠল।