“আমি ওই কচি বয়সে যে ভুল করেছি..”-পকসো কেসে ‘জয়’ পেয়ে মেয়েদের যে বার্তা দিলেন তরুণী

সমাজ যাকে বিচার করেছে, বাবা-মা যাকে পরিত্যাগ করেছে, সরকার যাকে সুরক্ষা দিতে পারেনি, এবং বিচারব্যবস্থাকে যাকে ন্যায়বিচার দিতে সংবিধানের ১৪২ ধারা প্রয়োগের বিরল সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, সেই ২১ বছরের তরুণী আজ বলছেন, “আমি ওই কচি বয়সে যে ভুল করেছি, সেই ভুল যেন আর আমার বয়সি মেয়েরা না-করে।” নাবালিকা অবস্থায় ভালোবেসে তিনি যে পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন, তার ভালোবাসার মানুষটিকে জেল খাটতে হয়েছে, পদে পদে বিপদ এসেছে — সেই ‘ভুল’ যাতে অন্য কোনো নাবালিকা না করে, নিজের জীবনের উদাহরণ দিয়ে এখন সেই বার্তাই দিচ্ছেন তিনি।

প্রেমের চরম মূল্য ও আইনি জটিলতা
দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুরে শ্বশুরবাড়িতে থাকা এই তরুণীর নিজের বাড়ি সোনারপুরে হলেও, নাবালক বয়সেই বাবা-মা তাঁকে পরিত্যাগ করেছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের বিরল রায়ের পর এই তরুণী বলছেন, “যে ভুল আমি করেছি কিশোরীবেলায়, তা যেন আমার বয়সি মেয়েরা না করে। ১৮ বছরের আগে প্রেম করলেও বিয়ে নয়, পালিয়ে যাওয়া নয়— এটা এখন বুঝতে পারি।”

একটু জিরিয়ে নিয়ে তাঁর সংযোজন, “আমার বড় কোনও বিপদ হয়নি, কিন্তু হতেও পারত। নিজের উদাহরণ দিয়ে আশপাশের কিশোর-কিশোরীদের সময় পেলেই বোঝাই। আমি তো আমার সেই বয়সটা ফিরে পাব না, কিন্তু ওদের তো কাঁচা বয়স! কাউকে যদি ভালোবাসো, তা হলেও অপেক্ষা কোরো। এ ভাবে কম বয়সে পালিয়ে যেও না।”

তিনি সত্যিই এক ‘উদাহরণ’। তাঁর বাস্তব পরিস্থিতি ও লড়াই দেশের সর্বোচ্চ আদালতকেও এই পকসো কেসটি নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে, যা ‘আইনের চোখে অপরাধ’। ফলস্বরূপ, তরুণীর স্বামীকে ‘দোষী’ সাব্যস্ত করেও সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করে কোনো শাস্তি দেয়নি সর্বোচ্চ আদালত। এই মামলাকে ‘আই ওপেনার’ বলে মন্তব্য করে আগামী ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে কেন্দ্রীয় নারী ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রক এবং সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে শীর্ষ কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, এই ধরনের পকসো কেসে কী করা হবে তার ‘ফ্রেমওয়ার্ক’ জমা দিতে।

কঠিন লড়াইয়ে পরিবারের পাশে থাকা
নিজের লড়াইয়ের কথা বলতে গিয়ে তরুণী জানান, “আমি ২০১৯-এ পালিয়ে আসি। ২০২১-এর মে মাসে করোনার মধ্যে আমার মেয়ে হয়। ওই বছরের শেষে পুলিশ আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে যায়! পরে নিম্ন আদালত ওঁকে ২০ বছরের সাজা দেয়!” এরপর ধরা গলায় তিনি বলেন, “কচি মেয়েটার মুখ আমায় শক্তি দিয়েছিল। আর পাশে ছিলেন আমার শ্বশুরবাড়ির সকলে। আমার জন্যই আমার বরকে জেলে যেতে হয়েছিল। তা বলে ওঁরা কেউ আমার পাশ থেকে সরে যাননি।”

তিনি এ-ও জানান, মেয়ের জন্য কৌটোর দুধ কিনে দেওয়া থেকে শুরু করে সব কিছু তাঁর ননদ-দেওররা করেছেন। তাঁর কথায়, “বাবাকে দেখতে না পেয়ে মেয়ে খুব কাঁদত। ওর শরীর খারাপ হয়। জেলে দেখা করতে গেলেও আমাদের সামনে যেতে দিত না। কাচের আড়াল থাকত। ফোনে কথা বলতে হতো উল্টোদিকে বসে।”

তরুণীর মেয়ে তখন বড়জোর ন’–দশ মাসের। সে শুধু কাচের দেওয়ালে ধাক্কা দিত, বাবাকে ছুঁতে চাইত, কিন্তু পারত না। তরুণীর কথায়, “ওর জন্যই লড়াইটা করতে পেরেছি। আমার শাশুড়ি ক্যান্সার আক্রান্ত ছিলেন। তা সত্ত্বেও আমাকে সব সময়ে সাহস জুগিয়েছেন। ওঁর চিকিৎসার জন্য অন্য রাজ্যেও দেওররা নিয়ে যান, সেখানেও মোটা খরচ। কিন্তু কেউ আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি।”

এর পাশাপাশি স্বামীর জন্য মামলা লড়তে গিয়ে প্রায় আড়াই লক্ষ টাকা ধার নিতে হয়েছে। অনেকে ভুল বুঝিয়ে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, কিন্তু স্বামী ছাড়া পাচ্ছিলেন না। তরুণী এখন বলছেন, “আমি জানতাম না, কোথায় গেলে সাহায্য পাব। নিজের বুদ্ধিতে যা কুলিয়েছে, করেছি।”

সুপ্রিম কোর্টের মানবিক সিদ্ধান্ত ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সম্ভবত এই হয়রানির কারণেই সুপ্রিম কোর্টও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় রায়ে লিখেছে, “এই পরিস্থিতিতে আইনের চোখে অপরাধীকে শাস্তি দিলে ভিক্টিম (যদিও সে নিজে তা মনে করে না) তার শিশুসন্তানকে নিয়ে কোথায় যাবে? তাই আমরা শাস্তিদানে বিরত থাকলাম।”

এই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রাজ্য সরকারকে তিন এক্সপার্টকে নিয়ে একটি কমিটি তৈরি করে রিপোর্ট দিতে বলেছিল। সেই কমিটির এক সদস্য পাভলভ হসপিটালের জয়িতা সাহা জানান, “সাধারণত এই ধরনের ইলোপমেন্ট কেসে আমরা দেখি সম্পর্কের জন্য মূল তিনটি বিষয় — ইন্টিমেসি, প্যাশন ও কমিটমেন্ট-এর মধ্যে প্রথম দু’টি থাকলেও তিন নম্বরটা হামেশাই থাকে না। এ ক্ষেত্রে ছিল একদম উল্টো। মেয়েটির কমিটমেন্ট তাঁর স্বামীর প্রতি এতটাই বেশি ও স্বামীরও তাই— সেটাই আমাদের মুগ্ধ করে।” তিনি জানান, ওই অঞ্চলের বহু মানুষের সঙ্গে র‍্যান্ডম ভাবে কথা বলে তাঁরা নিশ্চিত হন যে, মেয়েটি কোনো চাপের মুখে কিছু বলছে না। তাঁরা সত্যিই নিজেদের শিশুকন্যাকে নিয়ে ভালো আছেন। অভাব আছে, কিন্তু কারও প্রতি কোনো অভিযোগ নেই।

এখন তরুণী মাধ্যমিক দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁর কথায়, “মাধ্যমিক পাশ করে কোনও একটা ভোকেশনাল ট্রেনিং নেব। আমি আয়ার কাজ জানি। সেটা আরও ভালো করে শিখে চেষ্টা করব স্থানীয় কোনো স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কাজ পেতে। কারণ, আরও পড়ার ইচ্ছে থাকলেও সংসার-মেয়ে সামলে পেরে উঠব না। তা ছাড়া ঋণ মেটাতে অনেক টাকা দরকার, রোজগারও তো করতে হবে।”

তরুণীর মেয়ে এখন কেজি ওয়ানে পড়ে। আপাতত দু’জনে রোজগার করে ঋণ মিটিয়ে ভালোবাসায় মোড়া ‘ভালো বাসা’ই তাঁদের লক্ষ্য। আর যাঁর জন্য এত লড়াই, তাঁর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে কিছুটা লাজুক গলায় তরুণী বললেন, “ওকে ছাড়া বাঁচব না বলেই তো…”