গাজায় একমুঠো খাবারের জন্য হাহাকার, ৪৮ ঘণ্টায় অনাহারে ১৪ হাজার শিশুর মৃত্যু হতে পারে!

গাজায় মানবিক পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে যে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৪ হাজার শিশুর মৃত্যু হতে পারে বলে আশঙ্কাজনক সতর্কবার্তা দিয়েছে জাতিসংঘ। গত তিন মাস ধরে ইসরায়েলের কঠোর মানবিক অবরোধের ফলে গোটা গাজা এখন কার্যত এক দুর্ভিক্ষ-বিধ্বস্ত মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। চারদিকে শুধু লাশ আর ধ্বংসস্তূপের স্তূপ, বাতাসে বারুদ আর পোড়া লাশের কটু গন্ধ মিশে এক শ্মশানের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
বিবিসি রেডিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার বলেন, “যতটুকু ত্রাণ গাজায় প্রবেশ করেছে, তা সমুদ্রে এক ফোঁটা জলের মতো।” তিনি ১৪ হাজার শিশুর প্রাণ রক্ষার আকুতি জানিয়েছেন, যাদের হাতে সময় প্রায় নেই বললেই চলে। ফ্লেচার আরও জানান, গাজায় জাতিসংঘের ত্রাণকর্মীরা এখনও কাজ করছেন, যদিও ইসরায়েলের বোমা হামলায় তাদের অনেকেই নিহত হয়েছেন।
গাজা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ২,৯০,০০০ শিশু মারাত্মক অপুষ্টির শিকার। প্রতিদিন গড়ে ১১ লক্ষেরও বেশি শিশু ন্যূনতম পুষ্টির জোগান পাচ্ছে না। গাজার মিডিয়া অফিস এক সরকারি বিবৃতিতে জানিয়েছে, “ক্ষুধা ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা এই অপরাধে মদদ জুগিয়ে চলেছে।”
এই পরিস্থিতিতে অনাহারে অন্তত ৫৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যাদের অধিকাংশই শিশু ও বৃদ্ধ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বারবার বলছে, এই অবরোধ ও সাহায্য আটকে রাখার কৌশল আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধ।
সোমবার জাতিসংঘ জানিয়েছে, গাজায় ইসরায়েলি হামলায় আরও তিনজন জাতিসংঘ কর্মী নিহত হয়েছেন। আল জাজিরার খবর অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে দুজন জাতিসংঘ পরিচালিত একটি স্কুলে আশ্রয় নিতে এসে বোমার আঘাতে প্রাণ হারান।
বিশ্বের বহু সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থার দাবি, গাজায় বর্তমান সংঘাতের শুরু থেকে এখনও পর্যন্ত ২০০-রও বেশি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। চিকিৎসাকর্মী, উদ্ধারকারী দল এমনকি জাতিসংঘের গাড়ির উপরেও একাধিকবার হামলা হয়েছে। অনেকের মতে, এটি ইসরায়েলের একটি পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ, যাকে বিশেষজ্ঞরা ‘গণহত্যা’ বলেই ব্যাখ্যা করছেন।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে এবার কঠোর বার্তা দিয়েছে ব্রিটেন। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সংসদে জানান, “ইসরায়েলের এই আগ্রাসন একেবারেই অসহনীয়। আমরা অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির দাবি জানাচ্ছি।” এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটেন ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান মুক্ত বাণিজ্য আলোচনাও স্থগিত করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, ইসরায়েলের উগ্রপন্থী বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছেন বিদেশ সচিব ডেভিড ল্যামি।
ল্যামি বলেছেন, “আমি নিজে পশ্চিম তীরে গিয়ে দেখেছি, কীভাবে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা নিরীহ ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের উপর অত্যাচার করছে। এই হিংসা বন্ধ করার দায়িত্ব ইসরায়েল সরকারের। কিন্তু তারা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে, আর তাতেই দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠছে।”
এই রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত মঙ্গলবার গাজায় ইসরায়েলের বিমান হামলায় নতুন করে কমপক্ষে ৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, গাজা সিটির একটি স্কুল-আশ্রয়কেন্দ্রে চালানো হামলায় এক গর্ভবতী মহিলাও প্রাণ হারিয়েছেন। এই ধরনের হামলার একটাই লক্ষ্য—ভয় দেখানো, ধ্বংস ও গণহত্যা।
সরকারি হিসেবে গাজায় এখনও পর্যন্ত প্রায় ৫৩,০০০-রও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে গাজা প্রশাসনের তথ্য বলছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা হাজার হাজার মৃতদেহ ধরলে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা ৬১,৭০০-রও বেশি। আহতের সংখ্যা ১,২১,০০০ ছাড়িয়েছে।
বিশ্বের বহু দেশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘কঠোর পদক্ষেপ’ নেওয়ার কথা বললেও, তা এখনও পর্যন্ত বড়সড় কোনও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারেনি। এই অবস্থায় জাতিসংঘের সর্বোচ্চ স্তর থেকে যেভাবে শিশু মৃত্যুর আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, তা বিশ্ব বিবেককে না জাগালে আর কাকে জাগাবে? গাজায় বর্তমানে যা পরিস্থিতি, তা আক্ষরিক অর্থেই মানব সভ্যতার অন্যতম কুত্সিত ও নৃশংস ঘটনার উদাহরণ।