‘সিঁদুর’-এ বিরোধী মেঘ, ইউসুফকে পাঠাচ্ছে না TMC, কূটনৈতিক কৌশলের গন্ধ পাচ্ছেন বিরোধীরা

পহেলগাঁওয়ের ঘটনায় ২৬ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যুর পর পাকিস্তানের মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তুলতে কেন্দ্র সরকার বিভিন্ন দেশে সাতটি সর্বদলীয় কূটনৈতিক প্রতিনিধিদল পাঠানোর যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা ঘিরে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক তরজা। এই উদ্যোগকে বিজেপির ‘রাজনৈতিক কৌশল’ আখ্যা দিয়ে তীব্র সমালোচনায় মুখর হয়েছে বিরোধী দলগুলি। প্রথমে নাম পাঠিয়েও শেষ মুহূর্তে এই সফর থেকে তাদের প্রতিনিধি প্রত্যাহার করে নিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস।

কেন্দ্রের তরফে সাতটি প্রতিনিধিদল বিভিন্ন দেশে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার মধ্যে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলিও রয়েছে। বিভিন্ন পার্টির গুরুত্বপূর্ণ সাংসদদের এই প্রতিনিধিদলে অন্তর্ভুক্ত করার কথা।

তৃণমূলের প্রথমে সম্মতি, তারপর প্রত্যাহার

তৃণমূল কংগ্রেস প্রথমে এই প্রতিনিধিদলে লোকসভার সাংসদ ইউসুফ পাঠানকে পাঠানোর পরিকল্পনা করেছিল। বিদেশ মন্ত্রক ও সংসদীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর তরফে ইউসুফ পাঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁর পাসপোর্ট সংক্রান্ত নথি সংগ্রহ করা হয় এবং সম্ভাব্য সফরসূচিও তাকে জানানো হয়। জানা গিয়েছিল, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, কোরিয়া সফরকারী গ্রুপ থ্রি ডেলিগেশন টিমে তার থাকার কথা ছিল।

কিন্তু রবিবার তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব হঠাৎই সিদ্ধান্ত নেয় যে এই সফরে তাদের কোনও প্রতিনিধি যাবেন না। এই বিষয়ে তৃণমূলের রাজ্যসভার নেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন বলেন, “আমরা সর্বদা দেশের ও জাতীয় স্বার্থের পক্ষে। কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতি পরিচালনা করা কেন্দ্রের দায়িত্ব। সেটা তারাই করুক।” দলীয় সূত্রে আরও জানানো হয়েছে, তৃণমূল একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ দল এবং কোনও প্রতিনিধিদলে কারা যাবেন, তা বিজেপি বা কেন্দ্র ঠিক করতে পারে না। দলনেত্রী বা নেতৃত্বকে না জানিয়ে সংশ্লিষ্ট সাংসদের সঙ্গে সরাসরি ফোন করে পাসপোর্ট চাওয়াটা তৃণমূল নেতৃত্ব ভাল চোখে দেখছে না।

বিরোধীদের কটাক্ষ: এটি কি ‘বরযাত্রী’?

শুধু তৃণমূলই নয়, শিবসেনা (উদ্ধব গোষ্ঠী) এবং কংগ্রেসও এই সর্বদলীয় কূটনৈতিক সফরের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, আমেরিকার চাপ এবং পহেলগাঁওয়ের ঘটনায় দেশজুড়ে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা থেকে জনতার নজর ঘোরাতেই বিজেপি এই উদ্যোগ নিয়েছে। তারা এটিকে নিছক কূটনৈতিক কৌশল না দেখে বিজেপির রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখছে।

শিবসেনা (উদ্ধব গোষ্ঠী)-র নেতা সঞ্জয় রাউত এই বিদেশ সফরকে উপহাস করে ‘বরযাত্রী’ বলেও কটাক্ষ করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, “এভাবে বরযাত্রী পাঠানোর প্রয়োজন কী? প্রধানমন্ত্রীর এমন তাড়াহুড়ো করার কোনও দরকার ছিল না। উপ-মুখ্যমন্ত্রীর ছেলে শ্রীকান্ত শিন্ডে বিদেশে গিয়ে কীসের প্রতিনিধিত্ব করবেন?” সঞ্জয় রাউত ইন্ডিয়া জোটকে এই সফর বয়কট করার পরামর্শও দিয়েছেন।

কংগ্রেসের অন্দরে শশী থারুর বিতর্ক

মার্কিন মুলুকে প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে রয়েছেন কংগ্রেস সাংসদ এবং প্রাক্তন কূটনীতিক শশী থারুর। কেন্দ্র সরকার তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ দলের নেতা হিসেবে বেছে নেওয়ায় কংগ্রেসের অন্দরেই বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কংগ্রেস আগেই কেন্দ্রের কাছে চারটি নামের তালিকা পাঠিয়েছিল—আনন্দ শর্মা, গৌরব গগৈ, সৈয়দ নাসির হুসেন এবং রাজা ব্রার। কিন্তু সেই তালিকার বাইরে গিয়ে সরকার শশী থারুরকে বেছে নেওয়ায় অস্বস্তিতে পড়ে কংগ্রেস। কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা জয়রাম রমেশ বলেছেন, “কংগ্রেসে থাকা আর কংগ্রেসের হওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ আছে।” তার বক্তব্য, আলোচনা করে নাম চেয়েও পরে কেন্দ্র নিজে থেকেই শশী থারুরের নাম জানিয়েছে।

বিজেপি বিরোধী জোট এই কূটনৈতিক উদ্যোগে আদৌ অংশগ্রহণ করে কি না, এখন সেটাই দেখার। তবে এখনও পর্যন্ত বিরোধীরা একে বিজেপির ‘রাজনৈতিক চাল’ হিসেবেই দেখছে। সাতটি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে রয়েছেন শশী থরুর, রবিশঙ্কর প্রসাদ, বৈজয়ন্ত পাণ্ডা, সঞ্জয় কুমার ঝা, কনিমোই করুণানিধি, সুপ্রিয়া সুলে এবং শ্রীকান্ত শিন্ডে। এই দলগুলিতে বিভিন্ন দলের সাংসদদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।