“টাকা নেই, এই যুক্তি খাটে না”-ছ’সপ্তাহে মেটাতে হবে ২৫% বকেয়া, আপলোড হলো সুপ্রিম রায়

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারি কর্মীদের বকেয়া মহার্ঘ ভাতার (ডিএ) মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিয়েছে। শুক্রবার মৌখিকভাবে তিন মাসের মধ্যে বকেয়ার এক চতুর্থাংশ মেটানোর কথা বললেও, শনিবার শীর্ষ আদালতের ওয়েবসাইটে আপলোড হওয়া লিখিত নির্দেশে সময়সীমা কমিয়ে ছ’সপ্তাহ করা হয়েছে। বিচারপতি সঞ্জয় কারোল এবং বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ রাজ্য সরকারকে এই নির্দেশ দিয়েছে।
শনিবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ডিএ মামলার যে অন্তর্বর্তী নির্দেশ আপলোড হয়েছে, তাতে আদালত স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, কলকাতা হাইকোর্ট ২০২২ সালের ২০ মে এবং ২২ সেপ্টেম্বর এই মামলায় যে রায় বা নির্দেশ দিয়েছিল, তার ভিত্তিতে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া ডিএ বাবদ যা প্রাপ্য হয়, সেটার অন্তত ২৫ শতাংশ আগামী ছ’সপ্তাহের মধ্যে রাজ্যকে মিটিয়ে দিতে হবে। শুক্রবার শুনানি শেষে বিচারপতিদের বেঞ্চ মুখে মুখে তিন মাসের কথা বললেও, লিখিত নির্দেশে সময়সীমা কমিয়ে ছ’সপ্তাহ করা হয়েছে।
শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময় রাজ্য সরকারের পক্ষে সওয়াল করতে এসে দুই বর্ষীয়ান আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি এবং হুজ়েফা আহমেদি বারবার রাজ্যের আর্থিক দুরবস্থার কথা তুলে ধরে বলেছিলেন যে, বকেয়া ডিএ মেটাতে গেলে রাজ্যের আর্থিক অবস্থার উপর প্রবল চাপ পড়বে, রাজ্যের মেরুদণ্ড ভেঙে যাবে। কিন্তু বিচারপতি কারোল এবং বিচারপতি মেহতার বেঞ্চ শুনানির সময়ই রাজ্যের এই যুক্তিকে সরাসরি উড়িয়ে দিয়েছিল। লিখিত নির্দেশেও সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ বলেছে, “এর আগে স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইব্যুনাল (স্যাট) এবং কলকাতা হাইকোর্টও পঞ্চম বেতন কমিশন অনুযায়ী রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ডিএ পাওয়ার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ডিএ মেটানোর ক্ষেত্রে ফান্ডের অভাবের যে যুক্তি রাজ্য সরকার দেখাচ্ছে, সেই যুক্তিকেও স্যাট এবং হাইকোর্ট আগেই খারিজ করে দিয়েছে।”
আদালত আরও জানিয়েছে, এই অন্তর্বর্তী নির্দেশে বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ মেটানোর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু এর সঙ্গে গোটা মামলার সম্পূর্ণ শুনানি শেষে চূড়ান্ত রায় কী হবে, তার কোনো সম্পর্ক নেই। পাশাপাশি, এই মামলার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষের আইনি অধিকার বা তাদের যুক্তির সঙ্গেও এই অন্তর্বর্তী নির্দেশের কোনো যোগ নেই।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০১৬ সালে এই ডিএ মামলার সূত্রপাত হওয়ার পর থেকেই যে মূল প্রশ্নটা বারবার উঠেছে, তা হলো, রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ডিএ পাওয়া কি আদৌ তাদের মৌলিক অধিকার? রাজ্য সরকারের তরফে বরাবরই যুক্তি ছিল যে এটি সরকারি কর্মীদের মৌলিক অধিকার নয়, ডিএ হলো সরকারের তরফ থেকে একটি ‘দয়ার দান’। প্রথমে রাজ্যের ট্রাইব্যুনাল বা স্যাট রাজ্য সরকারের এই অবস্থানে সায় দিলেও, পরবর্তী সময়ে এই সিদ্ধান্ত কলকাতা হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ হয়। কলকাতা হাইকোর্ট সরকারি কর্মচারীদের ডিএ পাওয়ার অধিকারকেই স্বীকৃতি দেয় এবং স্যাটের রায় খারিজ করে। এরপর মামলা ফের স্যাটে ফেরত গেলেও, তারপর থেকে স্যাট ও হাইকোর্ট মিলিয়ে অন্তত ছ’বার বকেয়া ডিএ-র প্রশ্নে সরকারি কর্মচারীরাই আইনি জয় পেয়েছেন। হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে রাজ্য সরকার শীর্ষ আদালতে যে মামলা করেছে, সেখানেও মূল প্রশ্ন এটাই— ডিএ কি সরকারি কর্মচারীদের মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে?
বিচারপতি কারোল ও বিচারপতি মেহতার বেঞ্চ তাদের অন্তর্বর্তী নির্দেশে এই মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত প্রশ্নটি নিয়েও মন্তব্য করেছে। রায়ে বলা হয়েছে, “অন্য আরও কয়েকটি বিষয়ের মতো ডিএ কর্মচারীদের মৌলিক অধিকার কি না, সেটাও আদালতের বিবেচনার জন্য তোলা হয়েছে। আমরা চূড়ান্ত শুনানির সময় অবশ্যই সেটা বিবেচনা করব। কিন্তু সেটা বিবেচনা করার মধ্যবর্তী সময়ে এই বকেয়া নিয়ে কর্মচারীরা অনন্তকাল প্রতীক্ষা করবেন, সেটা হতে পারে না।”
বহু আইনজ্ঞ সুপ্রিম কোর্টের এই অন্তর্বর্তী নির্দেশকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। তারা বলছেন, শীর্ষ আদালত স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছে যে, মূল মামলার রায় যাই হোক না-কেন, এই বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ টাকাটা আগামী ছ’সপ্তাহের মধ্যে রাজ্য সরকারকে মেটাতেই হবে। নির্দেশ না মানলে তা নিশ্চিত ভাবে আদালত অবমাননার সমতুল বলে ধরা হবে। এই সময়ের মধ্যে অন্তর্বর্তী নির্দেশের উপরে কোনো ‘রিভিউ’ বা ‘মডিফিকেশন’ অ্যাপ্লিকেশন করাও আইনি ভাবে অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। শীর্ষ কোর্ট সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে তাদের বক্তব্য চার সপ্তাহের মধ্যে লিখিত আকারে জানাতে বলেছে।
এখন সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, ২০০৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালের বকেয়া মহার্ঘ ভাতার ন্যূনতম ২৫ শতাংশ আগামী ২৭ জুনের মধ্যে (যা শনিবারের নির্দেশ আপলোডের পর থেকে প্রায় ছ’সপ্তাহ) মিটিয়ে দিতে যে প্রায় ১০ হাজার ৪৪২ কোটি ৭৩ লক্ষ টাকা প্রয়োজন, সেটা এখন কোথা থেকে আসবে? রাজ্য সরকারই বা এই পরিস্থিতিতে কী পদক্ষেপ করবে? এই বিষয়ে রাজ্যের অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “রায়টা ভালো করে পড়ে, বিশ্লেষণ করে তারপরে এ নিয়ে পদক্ষেপ করা হবে।”
এই রায় নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে রাজ্য বিজেপির মুখপাত্র শমীক ভট্টাচার্য বলেন, “যে সরকারি কর্মচারীরা এতদিন তৃণমূল সরকারের কাছে প্রতারিত হয়েছেন, তাঁরা যাতে তাঁদের ন্যায্য প্রাপ্য ডিএ পান, সেটাই আমাদের লক্ষ্য ছিল। তাই ডিএ মামলার প্রথম দিন থেকেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে বিজেপি এই লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং আমরা সরকারি কর্মীদের পাশে ছিলাম।”