জলের জন্য হাহাকার ‘এই’ গ্রামে! পাইপ, নলকূল থাকতেও ১.৫ কিলোমিটার হাঁটেন মা-বোনেরা

বাঁকুড়ার ছাতনা ব্লকের গুনিয়াদা গ্রাম। এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের ছবি এখানে। একদিকে সরকারি প্রকল্পের চিহ্ন হিসেবে গ্রামে পৌঁছেছে জলের পাইপলাইন, বসেছে একাধিক নলকূপ। আর অন্যদিকে, গ্রামের মা-বোনেরা আজও প্রখর রোদে হাঁড়ি-কলসি মাথায় নিয়ে দীর্ঘ মেঠো পথ পেরিয়ে চলেছেন প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরের ডাংরা নদীর দিকে। পানীয় জল থেকে শুরু করে রান্নার কাজ—সবকিছুর জন্যই ওই নদীর জলই তাদের একমাত্র ভরসা।
এটা কোনও সুদূর রাজস্থানের প্রত্যন্ত গ্রামের ছবি নয়। এ ছবি আমাদেরই পশ্চিমবঙ্গের, সেই বাঁকুড়া জেলার, যেখানে শুধুমাত্র পরিশ্রুত পানীয় জল বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য নাকি কয়েকশো কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে।
গুনিয়াদা গ্রামটি ছাতনা ব্লকের একেবারে শেষ প্রান্তে। মাত্র ২৬টি আদিবাসী পরিবারের বাস এখানে। গ্রামে পানীয় জলের প্রয়োজনে দুটি নলকূপ বসানো হয়েছিল বটে, কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, সেগুলির জল এতটাই দূষিত যে তা মুখে দেওয়ার যোগ্য নয়। পরবর্তীতে যখন বাঁকুড়া জেলা জুড়ে সরকারি উদ্যোগে বিশাল ব্যয়ে নলবাহিত জল সরবরাহের প্রকল্প শুরু হয়, তখন গুনিয়াদাতেও পাইপলাইন পৌঁছে যায় এবং বাড়ি বাড়ি কলও বসানো হয়।
কিন্তু সেই থেকে আজ পর্যন্ত বেশিরভাগ দিনই ওই কলগুলি শুকনো থাকে। গ্রামবাসীরা জানান, মাসে হয়তো মেরেকেটে দিন দশেক জল আসে, তাও এত সামান্য পরিমাণে যে একটি পরিবারের এক বেলার প্রয়োজন মেটানোও কঠিন। কোনও দিন এক বালতি জল মেলে তো কোনো দিন তাও জোটে না।
ফলে গ্রামের মানুষের জলকষ্ট মেটানোর একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই আদি ও অকৃত্রিম পদ্ধতি – ডাংরা নদীর জল সংগ্রহ। ভরদুপুরের গনগনে রোদ মাথায় নিয়ে, কাঁখে বা মাথায় জলের পাত্র নিয়ে দেড় কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া গুনিয়াদা গ্রামের মহিলাদের কাছে এক কঠিন রুটিন। কোটি কোটি টাকার প্রকল্পের সুবিধা যখন তাদের দোরগোড়ায় এসেও অধরা থেকে যায়, তখন এই পথচলা ছাড়া তাদের আর উপায় থাকে না।
সরকারি প্রকল্পের বিপুল খরচ সত্ত্বেও কেন গ্রামের মানুষ আজও জলের জন্য নদীর উপর নির্ভরশীল? এই প্রশ্ন তুলে স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্ব সরাসরি রাজ্যের শাসকদল তৃণমূলকে দায়ী করেছে। পাল্টা জবাব দিয়েছে তৃণমূল নেতৃত্ব ও স্থানীয় পঞ্চায়েত সমিতি। তাদের দাবি, গ্রামে জলের অভাব নেই, গ্রামবাসীরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘নাটক’ করছেন।
রাজনৈতিক দোষারোপের মধ্যেই গুনিয়াদা গ্রামের মানুষ, বিশেষ করে মহিলারা, আজও প্রতিদিন জলের জন্য মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিচ্ছেন। সরকারি খাতায় জলের সুবিধা পৌঁছে গেলেও তাদের বাস্তবে ভরসা সেই নদীই। কবে এই চরম বৈপরীত্যের অবসান হবে, সেদিকেই তাকিয়ে আছেন এই প্রান্তিক গ্রামের মানুষগুলো।