পাকিস্তানকে যোগ্য জবাব, সফল ‘অপারেশন সিঁদুর’! বৈঠকে বার্তা বিদেশ সচিবের

জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁও-এ নিরীহ পর্যটকদের উপর নৃশংস জঙ্গি হামলার উপযুক্ত জবাব দিতে পরিকল্পিতভাবে ‘মিডনাইট স্ট্রাইক’ বা মধ্যরাতের হামলা চালিয়েছে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী। ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে পরিচিত এই গোপন সামরিক অভিযানে পাকিস্তান ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদীদের একাধিক ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বুধবার বিদেশ সচিব বিক্রম মিসরি সেনার এক সাংবাদিক বৈঠকে এই অভিযানের সাফল্যের কথা নিশ্চিত করেছেন। ভারতের এই পদক্ষেপে গুঁড়িয়ে গেছে পাকিস্তানের সেইসব জঙ্গি আস্তানা, যেখান থেকে ভারতে হামলার ছক কষা হত। তবে এই অভিযান চলাকালীনই পাকিস্তানি সেনার পাল্টা গুলিবর্ষণে ৩ জন ভারতীয় নাগরিক শহিদ হয়েছেন।

বৈঠকে বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রি পহেলগাঁওয়ের হামলাকে ‘অতিবর্বরতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘পহেলগাঁও হত্যা অতিবর্বরতা। সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়াতে এই হামলা করা হয়েছিল। ধর্ম জেনে খুন করা হয়েছে পহেলগাঁওয়ের পর্যটকদের। ভারতের উন্নয়নের গতি স্তব্ধ করাতেই এই হামলা’। তিনি জানান, গত এপ্রিল মাসে পহেলগাঁওয়ে হামলার সময় জঙ্গিরা ঔদ্ধত্য দেখিয়ে বলেছিল, “মোদিকে গিয়ে জানিয়ো”। সন্ত্রাসবাদীদের এই সরাসরি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিল ভারত সরকার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তখন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন যে এই অপরাধীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।

বিদেশ সচিব জানান, ২৩ এপ্রিলই এই হামলার প্রত্যাঘাতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং সমস্ত তথ্য জোগাড় করেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বারবার ভারতে হামলা হতে থাকে, তাই পাকিস্তানকে যোগ্য জবাব দেওয়া হয়েছে। তাঁর কথায়, এর আগেও সন্ত্রাসের শিকার ৩৫০-র বেশি ভারতীয় নাগরিক। পহেলগাঁওয়ে হামলা চালানো লস্কর-ই-তৈবার শাখা TRF ছিল। জম্মু-কাশ্মীর যখন বিকাশের পথে ফিরছিল এবং পর্যটন থেকে কাশ্মীরিরা স্বনির্ভর হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই এই পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়। স্পষ্ট হয়ে গেছে যে জঙ্গিদের আশ্রয় দেয় পাকিস্তান। তিনি আবারও মনে করিয়ে দেন, মুম্বই হামলার পর সবচেয়ে বড় হামলা ছিল পহেলগাও হামলা।

এই ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর আওতায় ভারতীয় বায়ুসেনা বুধবার গভীর রাতে পাকিস্তান ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরের মোট ৯টি জঙ্গি ঘাঁটিকে নিশানা করে। এর মধ্যে রয়েছে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের বাহাওয়ালপুরের ২টি জায়গা, মুরিদকে এবং শিয়ালকোট। পাক অধিকৃত কাশ্মীরের মুজফ্ফরাবাদ, কোটলি এবং ভীমবের। এছাড়াও গুলপুর ও চক আমরুতে জঙ্গি ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়েছে ভারতীয় বায়ুসেনা। এই ঘাঁটিগুলির মধ্যে বাহাওয়ালপুরে জইশ-ই-মহম্মদের ঘাঁটি, মুরিদকেতে লস্কর-ই-তৈবার ঘাঁটি, সারজালে জইশ ঘাঁটি, শিয়ালকোটে হিজবুল মুজাহিদিনের ঘাঁটি, বারনালায় লস্করের ঘাঁটি, কোটলিতে জইশ ও হিজবুলের ঘাঁটি, মুজফ্ফরাবাদে লস্কর ও জইশের ঘাঁটি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।

ভারতীয় বায়ুসেনার এই পরিকল্পিত হামলায় অন্তত ৫০ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে। সবচেয়ে স্বস্তির খবর এই যে, অপারেশন সিঁদুরে অংশ নেওয়া বায়ুসেনার সমস্ত বিমানচালক নিরাপদে ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরে এসেছেন। বায়ুসেনার তরফে এই খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রক বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, এই অভিযানে লক্ষ্য স্থির রেখে আঘাত হানার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সংযম দেখিয়েছে ভারতীয় সেনা। কোনও পাকিস্তানি সামরিক ঘাঁটিকে টার্গেট করা হয়নি, শুধুমাত্র সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামোকেই নিশানা করা হয়েছে। ভারত এই প্রত্যাঘাত নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষাসচিবের সঙ্গে কথা বলেছেন অজিত ডোভাল। এছাড়াও রাশিয়া, ব্রিটেন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহীকেও এই বিষয়টি জানানো হয়েছে ভারতের তরফে।

এদিকে, ভারতীয় সেনার এই হামলা স্বীকার করে নিয়েছে পাকিস্তান। তারা তাদের ভূখণ্ডে হামলা ও হতাহতের দাবি জানিয়েছে। তবে ভারতীয় বায়ুসেনা/সেনার ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীনই পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণ রেখা এবং আন্তর্জাতিক সীমান্ত বরাবর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। এই পাক সেনার গুলিবর্ষণে পুঞ্চ অঞ্চলে ৩ জন ভারতীয় নাগরিক শহিদ হয়েছেন এবং কয়েকজন আহতও হয়েছেন। ভারতীয় সেনা পাল্টা যোগ্য জবাব দিয়েছে।

ভারতীয় সেনার এই বীরত্বপূর্ণ ও সফল অভিযানের পর দেশজুড়ে প্রশংসার ঝড় উঠেছে। কেবল সরকারি মহল নয়, বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং চলচ্চিত্র জগতের তারকারাও সেনার এই পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন। মাঝরাত থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডিং ‘অপারেশন সিঁদুর’ এবং ‘জয় হিন্দ’। দেশের শাসক ও বিরোধী দলের নেতারা নির্বিশেষে এই পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর বাসভবনে বসেই গোটা অপারেশনে নজরদারি চালান। কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং স্থল, নৌ এবং বায়ু সেনা, তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে কথা বলেন। ভারতীয় সেনাও তাদের এক্স হ‍্যান্ডলে পোস্ট করে লিখেছে, ‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, জয় হিন্দ’।

পহেলগাঁও হামলার পর ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মাধ্যমে দ্রুত পাল্টা জবাব দিয়ে ভারত বিশ্বকে বার্তা দিয়েছে যে তারা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে প্রস্তুত। একদিকে যেমন এই অভিযান জঙ্গি পরিকাঠামোর বড়সড় ক্ষতি করেছে এবং ভারতীয় পাইলটরা নিরাপদে ফিরে এসেছেন, তেমনই অন্যদিকে পাকিস্তানি সেনার কাপুরুষোচিত গুলিবর্ষণে ৩ জন ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু ঘটনার অন্য একটি দুঃখজনক দিক। এই ঘটনার পর নিয়ন্ত্রণ রেখায় উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।