‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সাফল্যে দেশজুড়ে উচ্ছ্বাস, প্রশংসায় পঞ্চমুখ রাজনৈতিক বিরোধীরাও!

জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁও-এ নৃশংস জঙ্গি হামলার প্রতিবাদে ফুঁসছিল গোটা দেশ। কবে প্রত্যাঘাত হবে, সেই অপেক্ষার বাঁধ ভাঙছিল ভারতবাসীর। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বুধবার গভীর রাতে পাকিস্তান ও পাক অধ্যুষিত কাশ্মীরে সুনির্দিষ্ট নিশানায় হামলা চালাল ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী। ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে পরিচিত এই অভিযানে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয় অন্তত ৯ টি জঙ্গিঘাঁটি, নিহত হয় প্রায় ৫০ জন জঙ্গি। ভারতের এই নির্ভুল এবং সফল সামরিক অভিযানের প্রশংসা এবার শোনা গেল রাজনৈতিক বিরোধীদের মুখেও। তবে এই অভিযান চলাকালীন নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর পাকিস্তানি সেনার পাল্টা গুলিবর্ষণে ৩ জন ভারতীয় নাগরিক শহিদ হয়েছেন।
গত এপ্রিল মাসে পহেলগাঁওয়ে নিরীহ পর্যটকদের উপর হামলার সময় জঙ্গিরা ঔদ্ধত্য দেখিয়ে বলেছিল, “মোদিকে গিয়ে জানিয়ো”। সন্ত্রাসবাদীদের এই সরাসরি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিল ভারত সরকার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তখন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন যে এই অপরাধীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। সেই প্রতিশ্রুতিরই প্রতিফলন দেখা গেল বুধবার রাতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ। বিদেশসচিব বিক্রম মিসরি এই ঘটনাকে মুম্বই হামলার পর ভারতের মাটিতে ঘটা অন্যতম বড় জঙ্গি হামলা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কড়া বার্তার পরই শুরু হয় ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর প্রস্তুতি। বুধবার গভীর রাতে, যখন অধিকাংশ দেশবাসী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখনই ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে সুনির্দিষ্ট নিশানায় হামলা চালায়। ভারতীয় বায়ুসেনা এই এয়ার স্ট্রাইকগুলি পরিচালনা করে। জানা গেছে, এই অভিযানে অত্যাধুনিক সরঞ্জামের সাহায্যে একের পর এক হামলায় পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের মুরিদকে, ভাওয়ালপুল, কোটলি ও মুজাফ্ফরবাদ সহ মোট ৯টি জঙ্গি ঘাঁটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। সরকারের তরফে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, শুধুমাত্র সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামোকেই নিশানা করা হয়েছে, পাকিস্তানের কোনও সাধারণ নাগরিক বা সামরিক কেন্দ্র লক্ষ্যবস্তু ছিল না। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বিবৃতিতেও এই অভিযান এবং তার উদ্দেশ্য স্পষ্ট করা হয়েছে। এই সফল অভিযানে প্রায় ৫০ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে বলে ভারতীয় পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
এদিকে, ভারতীয় সেনার এই হামলা স্বীকার করে নিয়েছে পাকিস্তানও। পাকিস্তান সেনার পক্ষ থেকে সাংবাদিক বৈঠক করে জানানো হয়েছে যে, ভারতের পক্ষ থেকে সেদেশের ৬টি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় হামলা চালানো হয়েছে এবং মোট ২৪টি হামলা হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, এই হামলায় পাকিস্তানের ৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন, ৩৫ জন আহত হয়েছেন এবং দু’জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
তবে ভারতীয় বায়ুসেনা/সেনার ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীনই পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণ রেখা এবং আন্তর্জাতিক সীমান্ত বরাবর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। বিশেষ করে পুঞ্চ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর ব্যাপক গোলাগুলি চলে। এই পাক সেনার গুলিবর্ষণে ৩ জন ভারতীয় নাগরিক শহিদ হয়েছেন। এছাড়া পুঞ্চ অঞ্চলে একজন মহিলা ও তাঁর মেয়ে আহত হয়েছেন বলেও খবর। ভারতীয় সেনার পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, গতকাল রাতে ও আজ ভোররাতে পাকিস্তান এই গুলিবর্ষণ করে এবং এই সময়েই ৩ জন ভারতীয়ের মৃত্যু হয়। ভারতীয় সেনা পাল্টা যোগ্য জবাব দিয়েছে।
ভারতীয় সেনার এই বীরত্বপূর্ণ ও সফল অভিযানের পর দেশজুড়ে প্রশংসার ঝড় উঠেছে। কেবল সরকারি মহল নয়, বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং চলচ্চিত্র জগতের তারকারাও সেনার এই পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন। মাঝরাত থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডিং ‘অপারেশন সিঁদুর’ এবং ‘জয় হিন্দ’। দেশের শাসক ও বিরোধী দলের নেতারা নির্বিশেষে এই পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন।
রাহুল গান্ধী: কংগ্রেস সাংসদ তথা লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, ‘আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে নিয়ে গর্ব বোধ করি। জয় হিন্দ’। পহেলগাম হামলার পর পরই তিনি সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে বলেছিলেন এবং কংগ্রেস সরকারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছিলেন।
মল্লিকার্জুন খাড়্গে: কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, ‘পাকিস্তান এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীর থেকে উদ্ভূত সকল ধরণের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের একটি জাতীয় নীতি রয়েছে। আমরা আমাদের ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর জন্য গর্বিত, যারা পাকিস্তান এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীরের সন্ত্রাসী শিবিরগুলিকে ধ্বসং করে দিয়েছে। আমরা তাদের দৃঢ় সংকল্প এবং সাহসকে সাধুবাদ জানাই।’ পহেলগামের হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে তিনি আরও বলেছেন, ‘জাতীয় ঐক্য ও সংহতি এখন সময়ের দাবি এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সর্বদা সশস্ত্র বাহিনীর পাশে আছে। আমাদের নেতারা অতীতে পথ দেখিয়েছেন এবং জাতীয় স্বার্থ আমাদের কাছে সর্বোচ্চ।’
তেজস্বী যাদব: আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদবের মুখেও ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রশংসা শোনা গেছে। এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লেখেন, “ভারত কখনও সন্ত্রাসবাদ বরদাস্ত করেনি। ভবিষ্যতেও তা করবে না। মায়ের কোল থেকে বোনের হাত ও স্ত্রীর সিঁথির সিঁদুর অক্ষয় করে আসছে আমাদের ভারতীয় সেনা।”
অখিলেশ যাদব: সমাজবাদী পার্টির সুপ্রিমো অখিলেশ যাদব ‘অপারেশন সিঁদুর’ লেখা পোস্টার পোস্ট করে লিখেছেন, ‘পরাক্রমের বিজয় নিশ্চিত।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘ভারত ও ভারতের সেনা বাবিনী কখনও কোনও ধরণের সন্ত্রাসবাদ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদ সহ্য করেনি এবং কখনও করবেও না।’ তার কথায়, “আমরা সত্য, অহিংসা এবং শান্তিতে বিশ্বাসী দেশবাসী… যারা সন্ত্রাসবাদকে উৎসাহিত করে তারা যদি আমাদের ঐক্য, অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্বের উপর আক্রমণ করে, তাহলে আমরা জানি কীভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে উপযুক্ত জবাব দিতে হয়। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে, ১৪০ কোটি ভারতীয় ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং সরকারের পাশে আছে।”
আসাদউদ্দিন ওয়াইসি: এআইএমআইএম চিফ আসাদউদ্দিন ওয়াইসি এক্স পোস্টে লিখেছেন, “পাকিস্তানে আমাদের সেনা বাহিনীর সার্জিক্যাল স্ট্রাইককে স্বাগত জানাই। পাকিস্তানকে এমন কঠিন শিক্ষা দিতে হবে যাতে আর একটি পহেলগাম আর কখনও না ঘটাতে পারে। পাকিস্তানের সন্ত্রাসী শিবির পুরোপুরি ধ্বসং ধ্বংস করতে হবে। জয় হিন্দ!”
সরকারি মহলেও এই পদক্ষেপ নিয়ে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বুধবার রাতে এক্স হ্যান্ডেলে লেখেন, “ভারত মাতা কি জয়।” বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বিশ্বকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখানোর আহ্বান জানান। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ভারতীয় সেনার প্রতি গর্ব প্রকাশ করেন। জানা গেছে, রাতভর জেগে এই অভিযানের দিকে নজর রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ, মহারাষ্ট্রের উপ মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে এবং কংগ্রেস নেতা রনদীপ সিং সুরজেওয়ালা প্রমুখ ‘অপারেশন সিঁদুর’ লেখা পোস্টার সমাজমাধ্যমে শেয়ার করেছেন।
বলিউড ও দক্ষিণী চলচ্চিত্র জগতের তারকারাও ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর এই বীরত্বপূর্ণ অভিযানের প্রশংসা করেছেন। অভিনেত্রী তথা বিজেপি সাংসদ কঙ্গনা রানাওয়াত, সুপারস্টার রজনীকান্ত এবং অভিনেতা অক্ষয় কুমার সেনার প্রতি সম্মান জানিয়ে পোস্ট করেছেন।
পহেলগাঁও হামলার পর ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মাধ্যমে দ্রুত পাল্টা জবাব দিয়ে ভারত বিশ্বকে বার্তা দিয়েছে যে তারা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে প্রস্তুত। একদিকে যেমন এই অভিযান জঙ্গি পরিকাঠামোর বড়সড় ক্ষতি করেছে, তেমনই অন্যদিকে পাকিস্তানি সেনার কাপুরুষোচিত গুলিবর্ষণে ৩ জন ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু ঘটনার অন্য একটি দুঃখজনক দিক। এই ঘটনার পর নিয়ন্ত্রণ রেখায় উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।