‘সাহায্য করতে চাই, তবে না নিলে জোর করা যায় না’ মুর্শিদাবাদে ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গে মমতা !

রাজ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী, বিশেষত মুর্শিদাবাদের জাফরাবাদে ঘটে যাওয়া সংঘাতের প্রেক্ষাপটে আজ কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদের উদ্দেশে রওনা দিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর এই সফরকে ঘিরে স্বভাবতই রাজনৈতিক মহলে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। রওনা হওয়ার আগে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী সেখানকার পরিস্থিতি, তাঁর সফরের উদ্দেশ্য এবং রাজ্য সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আমাদের সরকার সবসময় মানুষের পাশে থাকতে চায় এবং সকলকেই সাহায্য করতে প্রস্তুত। কিন্তু কেউ যদি কোনও কারণে সেই সাহায্য গ্রহণ করতে না চান বা প্রত্যাখ্যান করেন, তবে সেক্ষেত্রে আমাদের পক্ষে তো জোর করে কিছু করা সম্ভব নয়।” মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কারণ, মুর্শিদাবাদের নিহতদের পরিবারকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিন ধরেই পুলিশ এবং রাজ্য বিজেপির মধ্যে এক নজিরবিহীন টানাপোড়েন চলছে। অভিযোগ উঠেছে যে, ওই পরিবারগুলিকে সল্টলেকের একটি নির্দিষ্ট বাড়িতে এনে রাখা হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে পুলিশ অভিযোগ করেছিল যে, মৃতদের পরিবারের সদস্যদের নাকি অপহরণ করে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই মুর্শিদাবাদ থেকে পুলিশ সল্টলেকে পৌঁছায় এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে। পুলিশের দাবি ছিল, পরিবারের সদস্যরা তাদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। অন্যদিকে, পরিবারের পক্ষ থেকে পাল্টা অভিযোগ করা হয় যে, পুলিশ নাকি জোর করে তাদের ঘরে ঢোকার চেষ্টা করেছে এবং তাদের জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যেতে চাইছে। এই পরিস্থিতিতে ওই পরিবার রাজ্যপালকে চিঠি দেওয়ার পাশাপাশি পুলিশের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ হিসেবে আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছে। এমন এক জটিল পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রীর মুর্শিদাবাদ সফর এবং তাঁর মন্তব্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

মুর্শিদাবাদ সফরে কেন কিছুটা বিলম্ব হলো, সেই ব্যাখ্যাও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “আমি আগেই মুর্শিদাবাদ যেতে পারতাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে পরিস্থিতির যাতে অবনতি না হয় বা পরিবেশ আরও উত্তপ্ত না হয়ে ওঠে, সেটা আমি চেয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম পুলিশ এবং জেলা প্রশাসন মিলে আগে মানুষের আস্থা অর্জন করুক। যতক্ষণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হয়, ততক্ষণ আমাদের সেখানে গিয়ে পরিবেশ খারাপ করা উচিত নয়। এখন পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। তাছাড়াও আমার জগন্নাথ ধামের একটি পূর্বনির্ধারিত অনুষ্ঠান ছিল, যা অনেক আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেই আজ আমি মুর্শিদাবাদ যাচ্ছি।”

নিজের যাতায়াত এবং বিজেপির সঙ্গে তুলনা টেনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এখনকার আবহাওয়ায় হেলিকপ্টারে ভ্রমণ সুরক্ষিত নয়, হঠাৎ হঠাৎ বৃষ্টি আসছে। এই অবস্থায় সবকিছু চিন্তা করেই আমাকে আমার কর্মসূচি ঠিক করতে হয়। বিজেপির লোকেরা তো দিব্যি একটা কামরা (সেলুন কার) নিয়েই চলে যায়! আমরা ট্রেন চেয়েও পাই না, অথচ বিজেপি নেতাদের জন্য ৪ কামরার ট্রেন বরাদ্দ হয়! সাধারণত এগুলি মন্ত্রী, ডিভিশনাল কমিশনার, ইঞ্জিনিয়ার এবং জিএস-দের জন্যই নির্দিষ্ট থাকে। আমি দু’বারের রেলমন্ত্রী ছিলাম, আমি কখনও এই ধরনের সুবিধা নিইনি। সাধারণত আমি সাধারণ ট্রেনেই যাতায়াত করতাম। ওদের সরকার রয়েছে তাই ওরা সেলুন কার পায়, আমাদের তেমন সুযোগ নেই।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি কেন্দ্রের শাসনক্ষমতার সুবিধা ব্যবহারের দিকে ইঙ্গিত করেন।

মুখ্যমন্ত্রীর সফরসূচি অনুযায়ী, তিনি আজ বহরমপুর পৌঁছাবেন। তাঁর যাত্রাপথের দুই-তৃতীয়াংশ সড়কপথে হবে। বহরমপুরে আজ মুখ্যসচিব একটি প্রশাসনিক বৈঠক করবেন। এরপর আগামীকাল, মঙ্গলবার, মুখ্যমন্ত্রী ধুলিয়ানে যাবেন। সেখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হয়ে তিনি বলেন, “আমি জানি ধুলিয়ান থেকে লোকজনকে নিয়ে আসা হয়েছে। কে সেখানে থাকবেন বা কে ফিরে যাবেন, সেটা সম্পূর্ণ তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। ওরা (বিজেপি) ইতিমধ্যেই হয়তো টাকা দিয়ে দিয়েছে। আমরাও কিন্তু সরকারি সাহায্যের হাত বাড়ানোর জন্যই যাচ্ছি। কেউ যদি বলেন টাকা নেবেন না বা বাড়িতে থাকবেন না, সেটা তো আমাদের হাতে নেই। কিন্তু যারা আসবেন, আমি নিশ্চিতভাবে তাদের সঙ্গে কথা বলব।” তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, “যাদের বাড়ি ভাঙা হয়েছে, তাদের বাংলার বাড়ি প্রকল্পে নতুন বাড়ি তৈরি করে দেওয়া হবে। যাদের দোকান লুট হয়েছে, তাদেরও আমরা অর্থনৈতিকভাবে সাহায্য করব, যেমনটা আমি আগেই বলেছিলাম।”

ধুলিয়ান থেকে মুখ্যমন্ত্রী এরপর সুতিতে যাবেন, যেখানে তাঁর একটি সরকারি পরিষেবা প্রদান সংক্রান্ত অনুষ্ঠান রয়েছে। 1 সুতির অনুষ্ঠান শেষে তিনি বহরমপুর ফিরে আসবেন এবং সেখানেই রাত্রিযাপন করবেন। এরপর পরশুদিন, অর্থাৎ বুধবার, তিনি কলকাতা ফিরবেন বলে জানা গেছে। মুখ্যমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে মুর্শিদাবাদের পরিস্থিতি কেমন থাকে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।