মারণ টিউমার আক্রান্ত শিশু, ৩ বছরের শিশুকে উপবাসের নির্দেশ ধর্মগুরুর, তারপর…যা ঘটলো?

মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। মারণ ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত একটি ৩ বছরের শিশুকন্যাকে আধ্যাত্মিক গুরুর পরামর্শে আমৃত্যু উপবাস করানো হয়েছে। ‘সান্থারা’ নামক এই জৈন উপাসনা রীতি পালনের কয়েক মিনিটের মধ্যেই শিশুটির মৃত্যু হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে তীব্র শোরগোল এবং বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

কে এই ভিয়ানা জৈন? কী এই ‘সান্থারা’ বা ‘সাল্লেখানা’ রীতি?

মৃত শিশুকন্যাটির নাম ভিয়ানা জৈন। তার বয়স ছিল মাত্র ৩ বছর এবং সে ইন্দোরের একটি জৈন পরিবারের সন্তান। জৈন ধর্মাবলম্বী বাবা-মা ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী তাদের সন্তানকে দিয়ে ‘সান্থারা’ বা ‘সাল্লেখানা’ রীতি পালন করিয়েছিলেন। জৈন ধর্মে ‘সান্থারা’ মানে হল স্বেচ্ছায় আমৃত্যু উপবাস করা। আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি লাভ, ইহজগতের মায়া ত্যাগ এবং আত্মার মুক্তির জন্য এই রীতির মাধ্যমে ধীরে ধীরে খাদ্য ও জল বর্জন করা হয়। এটিকে অনেক সময় ‘সমাধি মরণ’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়।

ব্রেন টিউমারই কি কারণ? গুরুর পরামর্শ ও বাবা-মায়ের ব্যাখ্যা

ভিয়ানার বাবা-মা দু’জনেই পেশায় আইটি কর্মী। তাদের দাবি, মেয়ের মারণ ব্রেন টিউমার হয়েছিল এবং একজন জৈন সাধু বা গুরুর পরামর্শেই তারা সন্তানকে এই ‘সান্থারা’ রীতি পালনের সিদ্ধান্ত নেন।

সংবাদসংস্থা পিটিআই-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভিয়ানার বাবা পীযূষ জৈন জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে তার মেয়ের ব্রেন টিউমার ধরা পড়েছিল এবং অস্ত্রোপচারও করানো হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের পর কিছুদিন মেয়ে সুস্থ ছিল, কিন্তু মার্চ মাস থেকে তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। সে স্বাভাবিকভাবে খাবার বা জল কিছুই খেতে পারছিল না।

পীযূষ জৈনের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২১ মার্চ তারা মেয়েকে জৈন গুরু রাজেশ মুণি মহারাজের কাছে নিয়ে যান। মহারাজজি মেয়েকে দেখেই নাকি বলেছিলেন তার হাতে আর বেশি সময় নেই, মৃত্যু আসন্ন। তাই ‘সান্থারা’ রীতি পালন করানোই তার জন্য সঠিক হবে। জৈন ধর্মে এই রীতির গুরুত্ব অপরিসীম, তাই অনেক চিন্তাভাবনার পর তারা গুরুর পরামর্শ মেনে নেন। সান্থারা পালন করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভিয়ানার মৃত্যু হয়।

সান্থারা পালনে সর্বকনিষ্ঠের বিশ্ব রেকর্ড দাবি

ভিয়ানার বাবা-মা আরও একটি চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন। তাদের মতে, জৈন ধর্মের এই সান্থারা রীতি পালনে তাদের সন্তান ভিয়ানা গোটা বিশ্বে সর্বকনিষ্ঠ। এই মর্মে ‘গোল্ডেন বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’ ভিয়ানার নামে মরণোত্তর শংসাপত্রও দিয়েছে।

মেয়েকে কষ্ট পেতে দেখতে পারছিলেন না মা: কঠিন সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা

ভিয়ানার মা বর্ষা জৈন এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত কঠিন বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “কতটা কষ্টকর ছিল এই সিদ্ধান্ত নেওয়া, তা বলে বোঝানো যাবে না। ব্রেন টিউমারের কারণে আমার মেয়ে খুব কষ্ট পাচ্ছিল। এই অবস্থায় ওকে আর কষ্ট পেতে দেখতে পারছিলাম না। আমরা প্রার্থনা করি যেন পরজন্মে আমার মেয়ে অনেক সুখ পায়।”

আইনের চোখে সান্থারা: বিতর্ক ও আদালতের অবস্থান

জৈন ধর্মের এই সান্থারা প্রথাটি অতীতেও ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। ২০১৫ সালে রাজস্থান হাইকোর্ট এই রীতিকে আইনের চোখে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৬ (আত্মহত্যায় প্ররোচনা) এবং ৩০৯ (আত্মহত্যার চেষ্টা) ধারা অনুযায়ী এটিকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তবে দেশের সর্বোচ্চ আদালত একাধিক জৈন সংগঠনের দায়ের করা মামলার শুনানিতে রাজস্থান হাইকোর্টের ওই রায়ের উপর স্থগিতাদেশ জারি করে। ফলে বর্তমানে এই প্রথা পালনে আইনত কোনো বাধা নেই।