বাবা নেই, গোটা সংসার চালান মা একাই! মাধ্যমিকে সপ্তম অঙ্কন, কি বললেন মা?

জীবনে চলার পথটা সহজ ছিল না তার জন্য। ছোটবেলাতেই হারিয়েছিল পিতৃছায়া। কিন্তু সেই শোক বা অভাবের ছায়া তার স্বপ্নকে মলিন করতে পারেনি। গোটা সংসারের দায়িত্ব একা হাতে আগলে রাখা যে মা, আজ তিনিই পাড়ায় পাড়ায় পরিচিত হচ্ছেন ‘রত্নগর্ভা’ নামে। কারণ, তাঁরই সন্তান এবার মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলে এক তাক লাগানো সাফল্য এনে রাজ্যের নজরে চলে এসেছে।
শুক্রবার প্রকাশিত হলো ২০২৩ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষার বহু প্রতীক্ষিত ফলাফল। আর সেই ফলেই দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুর এলাকার ছেলে অঙ্কন বসাক তার অসাধারণ কৃতিত্ব দিয়ে রাজ্য মেধা তালিকায় সপ্তম স্থান অর্জন করেছে, প্রাপ্ত নম্বর ৬৮৯।
ছেলেবেলাতেই বাবাকে হারানোর পর অঙ্কনের মা-ই ছিলেন তার এবং পুরো সংসারের একমাত্র অবলম্বন। তিনি বর্তমানে গঙ্গারামপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকা। স্বামীর অনুপস্থিতিতে একা হাতে সংসার সামলে ছেলের পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া তাঁর জন্য এক কঠিন লড়াই ছিল। আজ ছেলের সাফল্যে সেই লড়াই যেন সার্থকতা পেয়েছে। কেমন ছিল সেই মুহূর্ত, যখন মা প্রথম ছেলের সাফল্যের খবর পান? অঙ্কনের মা জানান, মোবাইলে অন্যান্য খবরের সঙ্গে ছেলের ফলাফল দেখতে গিয়েই হঠাত্ করে তার নাম নজরে আসে। ঠিক তখনই গঙ্গারামপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের তাঁর কিছু সহকর্মীও ছুটে এসে জানান যে, তাঁর ছেলে রাজ্য স্তরে র্যা ঙ্ক করেছে। একদিকে সন্তানের অভাবনীয় সাফল্য, অন্যদিকে স্বামীর অনুপস্থিতিতে একা হাতে লড়াই করে তাকে এই জায়গায় নিয়ে আসার স্বীকৃতি – সব মিলিয়ে এক আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হয়। পাড়া-প্রতিবেশীরাও ছুটে এসে ‘রত্নগর্ভা’ মা-কে অভিনন্দন জানান।
তবে মাধ্যমিকে এমন তাক লাগানো ফলাফলের জন্য অঙ্কন কিন্তু আট-দশটা র্যা ঙ্ক হোল্ডারের মতো সারাদিন বই-মুখো হয়ে বসে থাকত না। তার মা জানিয়েছেন, অঙ্কন বড্ড মুডি। যখন ওর পড়তে ইচ্ছে করত, তখনই বসত। সময় ধরে পড়ার অভ্যাস ছিল না। কখনও দেখতাম ফোন নিয়ে বসে আছে, আবার কখনও গভীর মনোযোগে বই পড়ছে। তবে দিনের হিসেবে সব মিলিয়ে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা পড়াশোনা চলত। সেই নিজস্ব ছন্দেই পড়াশোনা করে সে আজ সাফল্য অর্জন করেছে।
নিজের সাফল্যের অনুভূতি প্রসঙ্গে অঙ্কন জানিয়েছে, সে আশা করেছিল যে মেধা তালিকার প্রথম দশের মধ্যেই থাকতে পারবে, বিশেষ করে পঞ্চম থেকে দশম স্থানের মধ্যে একটা জায়গা তার দখলে আসবে। আজ সেই আশা পূর্ণ হওয়ায় সে অত্যন্ত খুশি।
ভবিষ্যতে বিজ্ঞান নিয়ে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে অঙ্কন। ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষা তার আছে কিনা, তা অবশ্য স্পষ্ট করে জানা যায়নি। তবে অঙ্কন শুধু পড়াশোনাতেই নয়, অন্যান্য দিকেও সমান পারদর্শী। তাঁর মা জানিয়েছেন, পড়াশোনার পাশাপাশি অঙ্কন ক্যারাটেতেও ব্ল্যাক বেল্ট অর্জন করেছে। এছাড়াও, খেলাধুলার প্রতি তার আগ্রহ রয়েছে এবং অন্যান্য খেলাধুলোর সঙ্গেও যুক্ত ছিল।
বাবা হারানোর ব্যথা বুকে নিয়েও, মায়ের একা হাতে গড়া সংসারে থেকেই অঙ্কন বসাক তার মেধা ও কঠোর পরিশ্রম দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছে যে, প্রতিকূলতা যতই কঠিন হোক না কেন, সঠিক দিশা এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। তার এই গল্প আগামী প্রজন্মের কাছে এক বিরাট অনুপ্রেরণা।