এক ফোঁটা নয়! সিন্ধুর জল বন্ধ, সন্ত্রাসবাদের মূল্য চোকাতে হবে, পাকিস্তানকে কড়া বার্তা ভারতের

জম্মু ও কাশ্মীরের পাহেলগামে পর্যটকদের উপর হওয়া নারকীয় জঙ্গি হামলার ঘটনায় যখন গোটা দেশ ক্ষোভে ফুঁসছে এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম প্রত্যাঘাতের দাবি জানাচ্ছে, তখনই আন্তর্জাতিক মঞ্চে এক নজিরবিহীন কূটনৈতিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ নিল ভারত সরকার। প্রায় ছয় দশক আগে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ ‘সিন্ধু জলচুক্তি’ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রী সি আর পাটিল কেন্দ্রের এই সাহসী সিদ্ধান্তকে “জাতীয় স্বার্থে সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত” বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর সাফ এবং অত্যন্ত কড়া বার্তা, “ভারত নিশ্চিত করবে, সিন্ধু নদী থেকে এক ফোঁটাও জল পাকিস্তানে না যায়।” মন্ত্রীর এই মন্তব্যের পরই আন্তর্জাতিক মহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। পাকিস্তান একে কার্যত ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ বলেই আখ্যা দিয়ে কঠোর জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছে।
কী এই সিন্ধু জলচুক্তি?
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর জলসম্পদ বণ্টন নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় দু’দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় ‘সিন্ধু জলচুক্তি’। এই চুক্তি অনুযায়ী, সিন্ধু নদীব্যবস্থার মোট ছয়টি নদীর মধ্যে পূর্বের তিনটি নদী (রবি, বেয়াস, শতদ্রু) ভারতের সম্পূর্ণ অধিকারে আসে এবং পশ্চিমের তিনটি নদী (সিন্ধু, ঝিলম, চেনাব) থেকে পাকিস্তান জল পাওয়ার অধিকারী হয়। তবে এই পশ্চিমের নদীগুলির উৎস ভারতেই। গত কয়েক দশকে পাকিস্তান বারবার ভারতের বিরুদ্ধে এই চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে, বিশেষত ভারতের কিশনগঙ্গা ও রাটলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে তাদের আপত্তি ছিল। এবার সেই সমস্ত আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে ভারত তার অবস্থান স্পষ্ট করে দিল।
কেন স্থগিত করা হল চুক্তি?
ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সিন্ধু চুক্তি স্থগিতের মূল কারণ হিসেবে পাকিস্তানের ধারাবাহিক সন্ত্রাসবাদে মদত দেওয়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে। বুধবার সরকারের এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরদিন পাকিস্তানের জলসম্পদ মন্ত্রকের সচিবকে পাঠানো চিঠিতে ভারতের জলশক্তি মন্ত্রক স্পষ্ট জানায়, “সিন্ধু চুক্তি একমাত্র তখনই কার্যকর থাকতে পারে, যখন দুই পক্ষ পারস্পরিক বিশ্বাস, সদিচ্ছা ও আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলে। কিন্তু সীমান্তের ওপার থেকে ধারাবাহিকভাবে সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে দিয়ে পাকিস্তান সেই বিশ্বাসকে চরমভাবে লঙ্ঘন করেছে।”
সূত্রের খবর, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বাসভবনে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে জলশক্তি, বিদেশ মন্ত্রক এবং নিরাপত্তা বিভাগের শীর্ষ কর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানেই এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়। স্থির হয়, চুক্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত কেবল প্রতীকী নয়, এর বাস্তবায়নের কাজও অবিলম্বে শুরু হবে।
কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে?
চুক্তি স্থগিতের সিদ্ধান্তকে কার্যকর করতে ভারত বেশ কিছু বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করছে:
১. জল ধরে রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধি: ঝিলম, চেনাব এবং সিন্ধুর ধারে যে সমস্ত বাঁধ ও জলাধার আছে, সেগুলির থেকে পলি সরিয়ে ধারণক্ষমতা বাড়ানো হবে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানে যাওয়া জলের পরিমাণ কমে যাবে।
২. বিদ্যুৎ প্রকল্পে গতি: কিশনগঙ্গা (ঝিলমের শাখা নদীতে) এবং রাটলে (চেনাবের উপর নির্মীয়মাণ) জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে পাকিস্তানের আপত্তি থাকলেও, এবার ভারত সেসবে পাত্তা দেবে না। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলিকে দ্রুত শেষ করাই এখন লক্ষ্য।
৩. নতুন পরিকাঠামো নির্মাণ: দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় ভারত এই নদীগুলির জল দেশের কাজে আরও বেশি পরিমাণে ব্যবহার করার জন্য নতুন জলাধার ও বাঁধ নির্মাণ করবে। এই জল কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পানীয় জল সরবরাহে ব্যবহৃত হবে।
আন্তর্জাতিক স্তরে প্রস্তুতি
ভারতের এই কঠোর সিদ্ধান্ত ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে প্রতিক্রিয়া আসা অবশ্যম্ভাবী। বিশ্বব্যাংক কিংবা রাষ্ট্রপুঞ্জের মতো সংগঠন থেকে কূটনৈতিক চাপ আসতে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য কেন্দ্র ইতিমধ্যেই একটি আইনি ও কূটনৈতিক কোর টিম গঠন করেছে, যারা আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি তুলে ধরবে।
পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া
এই ঘোষণার পর পাকিস্তান সরকার কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার ইসলামাবাদ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “সিন্ধু চুক্তি অনুসারে পাকিস্তানের প্রাপ্য জল রুখে দেওয়া হলে তাকে আমরা যুদ্ধ ঘোষণার শামিল বলে বিবেচনা করব এবং পূর্ণ শক্তি দিয়ে জবাব দেব।”
দেশের মানুষের উপর প্রভাব?
সরকারি সূত্র আশ্বাস দিয়েছে, ভারতীয় নাগরিকদের জল সংক্রান্ত কোনও সমস্যা যাতে না হয়, তা নিশ্চিত করাই প্রথম অগ্রাধিকার। জলের প্রাপ্যতা যাতে নিরবচ্ছিন্ন থাকে, তার জন্যই কৌশলগতভাবে বাঁধ ও জলাধারের ব্যাবস্থাপনা পরিবর্তন করা হবে।
সিন্ধু জলচুক্তিকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি সফল জলবণ্টন চুক্তি বলে গণ্য করা হতো। এই চুক্তিকে সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার ভারতের সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র জলবণ্টনের প্রশ্ন নয়, এটি পাকিস্তানকে দেওয়া একটি অত্যন্ত শক্তিশালী কৌশলগত বার্তা— যে দেশ সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করে বা মদত দেয়, তার সঙ্গে বিশ্বাস এবং আন্তর্জাতিক নিয়মের ভিত্তিতে কোনও চুক্তি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারত বুঝিয়ে দিল যে সন্ত্রাসবাদের একটা মূল্য চোকাতে হবে।