“ভারত সরকার যে পদক্ষেপই করুক, বিরোধীদের পুরো সমর্থন রয়েছে”-রাহুল গান্ধী

পহেলগামে ২৬ নিরীহ পর্যটকের হত্যাকাণ্ডের পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। ভারতের কড়া পদক্ষেপের পাল্টা হিসেবে বৃহস্পতিবার সকালেই পাকিস্তান একাধিকার পদক্ষেপ ঘোষণা করে, যার মধ্যে ছিল ভারতের জন্য ভিসা বাতিল, সিমলা চুক্তি স্থগিত, ওয়াঘা সীমান্ত বন্ধ এবং পাক আকাশসীমা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা। এর জবাবে ভারত সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের ঘোষণা না দিলেও, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের হুঁশিয়ারি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে এই হামলার কড়া জবাব দিতে প্রস্তুত দিল্লি।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বৃহস্পতিবার বিহারের মধুবনীতে একটি সরকারি অনুষ্ঠানে নাম না করে পাকিস্তানকে কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, পহেলগামের হামলার পেছনে যারা রয়েছে, সেই জঙ্গি এবং তাদের মদতদাতাদের ধরতে ভারত প্রয়োজনে পৃথিবীর শেষপ্রান্তে পর্যন্ত ধাওয়া করবে এবং এমন শাস্তি দেবে যা তাদের কল্পনার অতীত। মোদী বলেন, “পহেলগামের হামলায় কেউ নিজের ছেলেকে হারিয়েছেন, কেউ ভাই, কেউ স্বামীকে। নিহতদের কেউ বাংলাভাষী, কেউ কন্নড়ভাষী, কেউ মারাঠি, ওডিয়া, গুজরাটি আবার কেউ এই বিহারের সন্তান। কার্গিল থেকে কন্যাকুমারী— সর্বত্র শোকের আবহ।” তিনি বলেন, এই হামলা শুধু নিরীহ পর্যটকদের উপর নয়, শত্রুরা ভারতের আত্মাকে আঘাত করার ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে। সন্ত্রাসকে সমূলে উৎখাতের সময় এসে গেছে এবং ১৪০ কোটি ভারতীয়ের সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তি সন্ত্রাসের মূলচক্রীদের কোমর ভেঙে দেবে। প্রধানমন্ত্রী হিন্দিতে বক্তৃতা দেওয়ার পাশাপাশি ইংরেজিতেও তার বার্তা অনুবাদ করে বিশ্বের উদ্দেশে বলেন, “পুরো বিশ্বকে বলতে চাই, ভারত প্রতিটি জঙ্গি এবং তাদের মদতদাতাকে শনাক্ত করে, ধরে ধরে শাস্তি দেবে। তাদের ধরতে প্রয়োজনে পৃথিবীর শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাবে। ভারতের উদ্যমকে ভাঙতে পারবে না সন্ত্রাস। যে কোনও মূল্যে ন্যায়বিচার হবেই। পুরো দেশ এ ব্যাপারে বদ্ধপরিকর।”

প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যের মধ্যেই কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বড় কোনও পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেখছেন। বিশেষ করে পহেলগাম হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মতো রাষ্ট্রনেতাদের সন্ত্রাস দমনের প্রশ্নে ভারতের পাশে থাকার বার্তা মোদীর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

এদিকে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পহেলগাম হামলা নিয়ে আলোচনা করার জন্য একটি সর্বদলীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী বৈঠক শেষে বলেন, “সব রাজনৈতিক দল সম্মিলিত ভাবে এই হামলার নিন্দা করেছে। ভারত সরকার এ ব্যাপারে যে পদক্ষেপই করুক, বিরোধীদের পুরো সমর্থন তাদের সঙ্গে রয়েছে।” বিরোধীদের এই সর্বসম্মত সমর্থন সরকারের হাত আরও শক্তিশালী করেছে।

সর্বদল বৈঠকের আগেই বৃহস্পতিবার বিকেলে রাষ্ট্রপতি এবং ভারতের তিন বাহিনীর প্রধান দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই জম্মু–কাশ্মীর–সহ দেশের সব আন্তর্জাতিক সীমান্তে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা শুরু করেছে ভারতীয় সেনা। সূত্রের খবর, পাকিস্তানও সীমান্তে সেনা বাড়িয়েছে এবং বাঙ্কারে থেকে ভারতের গতিবিধির উপর কড়া নজর রাখছে।

যদিও ২০১৬–এর সার্জিক্যাল স্ট্রাইক বা ২০১৯–এর বালাকোট এয়ারস্ট্রাইকের মতো সরাসরি সামরিক প্রত্যাঘাতের কোনও স্পষ্ট ইঙ্গিত এখনও পর্যন্ত মেলেনি, তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং হামলার পরেই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, “এমন জবাব দেবো, দুনিয়া দেখবে।” এরপরই বিদেশ মন্ত্রক পহেলগামের জঙ্গিহানায় সীমান্তপারের যোগসূত্রের কথা উল্লেখ করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পাঁচ দফা পদক্ষেপের ঘোষণা করেছিল।

সর্বদল বৈঠকে বিরোধীরা গোয়েন্দা ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তৃণমূলের তরফে লোকসভার দলনেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন করেন, এই ঘটনাকে বিজেপি কেন হিন্দু–মুসলিম সংঘাত হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে এবং বৈসরনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনস্থলে কেন কেন্দ্রীয় বাহিনী ছিল না। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্তারা বৈঠকে ব্যাখ্যা করেন যে কীভাবে হামলা হয়েছে এবং কোথায় ত্রুটি ছিল। এরপর প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, এই ধরনের হামলার পুনরাবৃত্তি রোধে সরকার কড়া পদক্ষেপ করবে। রাহুল গান্ধী উরি এবং পুলওয়ামার হামলার প্রসঙ্গ টেনে বার বার গোয়েন্দা ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও দেশের নিরাপত্তা ও অখণ্ডতার প্রশ্নে সরকারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।

বৈঠক শেষে সংসদ ও সংখ্যালঘু বিষয়ক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু জানান, সন্ত্রাস বিরোধী লড়াইয়ে সব রাজনৈতিক দলের এই মনোভাব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে তৃণমূল এই বৈঠককে ‘সর্বদলীয়’ না বলে ‘সংসদীয় দলের বৈঠক’ আখ্যা দিয়ে প্রশ্ন তোলে যে কেন সব রাজনৈতিক দলের সুপ্রিমোদের ডাকা হয়নি। যদিও এ বিষয়ে সরকারিভাবে কোনও জবাব দেওয়া হয়নি।