‘অমানবিক’ পরিস্থিতিতে কাজ! আরবান কোম্পানির কর্মীর দুরবস্থা ফাঁস, কাঠগড়ায় সংস্থা

আজকের শহুরে জীবনে অনেক কাজই সহজ করে দিয়েছে ‘আরবান কোম্পানি’র মতো অ্যাপ-ভিত্তিক পরিষেবা। এক ক্লিকেই বাড়িতে হাজির হয় বিভিন্ন পেশাদার কর্মী। বাথরুম পরিষ্কার থেকে শুরু করে এসি মেরামত, এমনকি পার্লারের পরিষেবাও এখন ঘরে বসেই পাওয়া যায়। তবে এই সুবিধার আড়ালে যে কর্মীদের কঠিন জীবন লুকিয়ে থাকতে পারে, তা সম্প্রতি প্রকাশ্যে আনলেন মুম্বইয়ের অঞ্জলি কেলকার নামের এক মহিলা গ্রাহক। তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট ভাইরাল হতেই কাঠগড়ায় উঠেছে খোদ সংস্থা কর্তৃপক্ষ।

অঞ্জলি জানান, বাড়িতে হোম-স্পা করাতে গিয়ে তিনি সংস্থার এক কর্মীর ‘অমানবিক’ কাজের পরিবেশ প্রত্যক্ষ করেছেন। এই পোস্ট দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করলে, অবশেষে আরবান কোম্পানি প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছে এবং কর্মীদের সুরক্ষা ও উন্নয়নে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

ঠিক কী ঘটেছিল?

অঞ্জলি কেলকার নিয়মিত আরবান কোম্পানির পরিষেবা ব্যবহার করেন। সম্প্রতি তিনি সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় একটি হোম স্পা বুক করেন, যা দিনের শেষ ফাঁকা স্লট ছিল। সন্ধ্যা সোয়া সাতটার দিকে থেরাপিস্ট নিশা (ছদ্মনাম) ফোন করে জানান, তাঁর পৌঁছতে ১৫-২০ মিনিট দেরি হবে। কারণ তাঁর আগের অ্যাপয়েন্টমেন্ট এইমাত্র শেষ হয়েছে এবং একটানা কাজের চাপে সারাদিন তিনি কিছুই খাননি।

অঞ্জলির নিজের সময় নিয়ে অসুবিধা থাকলেও, মানবিকতার খাতিরে তিনি রাজি হন। অঞ্জলি তাঁর পোস্টে লেখেন, “শেষমেশ নিশা রাত পৌনে ন’টায় পৌঁছলেন। তাঁর মুখ দেখে মনে হচ্ছিল তিনি খুবই ক্লান্ত এবং হতাশ। চোখে জলও ছিল। আমি তাঁকে জল ও কিছু খাবার দিলে তিনি কিছুটা শান্ত হন।”

এরপর নিশা তাঁর কঠিন অভিজ্ঞতার কথা অঞ্জলির কাছে খুলে বলেন। অঞ্জলি জানান, কর্মীরা অসুস্থ বা ক্লান্ত থাকলেও বুকিং বাতিল করতে পারেন না। পরপর তিনটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করলে তাঁদের প্রোফাইল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়, যার ফলে তাঁদের রোজগারে বড় ধাক্কা লাগে।

নিশার অভিযোগ অনুযায়ী, শহরের যানজটের কারণে অনেক সময় দেরি হলে গ্রাহকদের খারাপ রেটিং-এর শিকার হতে হয়। এছাড়াও, একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট শেষ করে অন্যটিতে যাওয়ার জন্য কোনও অতিরিক্ত সময় (টাইম বাফার) রাখা হয় না। ফলে কর্মীদের প্রায়শই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দ্রুত পৌঁছাতে হয়। এর উপর স্পা ও ম্যাসাজের মতো শারীরিক পরিশ্রমের কাজ একটানা করে যাওয়া অত্যন্ত কষ্টকর এবং এর মাঝে কোনও বিশ্রামও মেলে না।

শুধু তাই নয়, কর্মীদের নিজেদেরকেই ভারী ম্যাসাজ টেবিল ও অন্যান্য সরঞ্জাম বহন করতে হয়। নিশা জানান, এই একটানা শারীরিক কষ্টের কারণে তাঁর হার্নিয়াও ধরা পড়েছে।

অঞ্জলি আরও লেখেন, “এত ক্লান্ত থাকা সত্ত্বেও নিশা পুরো সেশনটি শেষ করেন এবং অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গেই করেন। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।”

তিনি প্রশ্ন তোলেন, এমন কঠিন কাঠামোর মধ্যে একটি পরিষেবা প্ল্যাটফর্ম কীভাবে টিকে থাকতে পারে? তিনি আরবান কোম্পানির নীতি ও কর্মীদের সহায়তার বিষয়গুলি পুনর্বিবেচনার দাবি জানান।

অঞ্জলি লেখেন, “এমন একটি পারফরম্যান্স সিস্টেম তৈরি করা হয়েছে যেখানে কর্মীদের ব্যর্থ হওয়াই স্বাভাবিক, এবং তার বিপরীতে কোম্পানি লাগাতার চাপ সৃষ্টি করে রেখেছে। এটা কি অমানবিক নয়? কর্মীদের কি ন্যায্য কারণে কাজ প্রত্যাখ্যান করার অধিকার থাকা উচিত নয়? শহরের যানজটের কথা মাথায় রেখে প্রতিটি অ্যাপয়েন্টমেন্টের মাঝে কি নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধান রাখা উচিত নয়? আর আমরা, গ্রাহকরা, কি আরও সংবেদনশীল হতে পারি না?”

তিনি সরাসরি আরবান কোম্পানিকে উদ্দেশ্য করে লেখেন, “আপনাদের টিমই আপনাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাঁদের যত্ন নিন।”

অঞ্জলির এই পোস্ট সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে, আরবান কোম্পানি একটি বিবৃতি জারি করে। তারা জানায়, “নিশার সঙ্গে আপনার মানবিক কথোপকথন আমাদের হৃদয় ছুঁয়েছে… এমন ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমাদের সার্ভিস পার্টনাররা কতটা প্রতিকূলতার মধ্যে কাজ করেন এবং একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তাঁদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের কর্তব্য!”

সংস্থাটি আরও জানায়, তারা তাদের সিস্টেমের উন্নতির জন্য কাজ করছে। বিশেষ করে বুকিং, সময়সূচি এবং কর্মীদের কল্যাণের বিষয়গুলি আরও সুসংহত করা হবে। তারা স্বীকার করে যে অঞ্জলির অভিজ্ঞতা এমন কিছু বাস্তব সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে, যা আরও মনোযোগের দাবি রাখে।