বিশেষ: সন্তানের মঙ্গল হবে নীলষষ্ঠীর ব্রত পালনে, জানুন পুজোর শুভ সময় ও নিয়ম সম্পর্কে

বাঙালির জীবনে এপ্রিল মাস জুড়ে থাকে নানা ধরনের লোক-উৎসব ও পার্বণ। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হল নীলষষ্ঠী বা নীলপুজো। বিশ্বাস করা হয়, এই দিন নিষ্ঠা ভরে পুজো করলে নীলকণ্ঠ মহাদেব, দেবী নীলচণ্ডিকা এবং মা ষষ্ঠীর কৃপা লাভ হয়। বিশেষত মায়েরা তাদের সন্তানের কল্যাণ এবং সন্তান লাভের পথে আসা বাধা থেকে মুক্তি পেতে এই ব্রত পালন করেন। এই দিনে মহিলারা মূলত তাদের সন্তানের মঙ্গল কামনায় উপবাস রাখেন এবং মহাদেবের মন্দিরে ভিড় জমান। যাদের বাড়িতে শিবলিঙ্গ রয়েছে, তারা বাড়িতেই এই পুজোর আয়োজন করেন।
নীলষষ্ঠী ২০২৫-এর দিনক্ষণ (Nil Sasthi Date):
সাধারণত চৈত্র সংক্রান্তির ঠিক আগের দিন অর্থাৎ চড়ক উৎসবের আগের দিন নীলপুজো পালিত হয়। এই বছর ১৩ই এপ্রিল, শনিবার (৩০শে চৈত্র) নীলপুজোর তিথি পড়েছে।
নীলষষ্ঠীর ব্রত পালনের শুভ সময় (Nil Sasthi Puja Timing):
এই পুজোর জন্য কোনো নির্দিষ্ট শুভ মুহূর্ত আলাদা করে না থাকলেও, নীলপুজোর দিন সন্ধ্যায় শিবলিঙ্গে জল ঢেলে সন্তানের নামে প্রদীপ বা মোমবাতি জ্বালানো সবচেয়ে শুভ বলে মনে করা হয়।
ব্রতের নিয়ম (Nil Sasthi Puja Rules):
নীলষষ্ঠীর দিন সারাদিন উপোস করে সন্ধ্যায় শিবের মাথায় জল ঢালতে হয়। এরপর শিবের মাথায় বেলপাতা, ফুল ও একটি ফল স্পর্শ করিয়ে রাখতে হয়। এরপর অপরাজিতা ফুলের মালা পরিয়ে সন্তানের নামে একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করতে হয়। উপোস ভাঙার পরও এদিন ফল, সাবু ইত্যাদি হালকা খাবার গ্রহণ করতে হয়। এমনকি সৈন্ধব লবণ দিয়ে তৈরি খাবার খাওয়ার নিয়ম প্রচলিত আছে। মনে করা হয়, ব্রতের দিন উপোস করে নিষ্ঠার সঙ্গে কিছু নিয়ম পালন করলে দেবাদিদেব মহাদেব ভক্তের মনোবাসনা পূরণ করেন।
নীলপুজোর ব্রত পালনের উপকরণ (Ingredients For Nil Pujo):
গঙ্গামাটি বা শুদ্ধ মাটি, বেল পাতা, গঙ্গা জল, দুধ, দই, ঘি, মধু, কলা, বেল, বেলের কাঁটা ও মহাদেবের পছন্দের যেকোনো ফুল এই পুজোর জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ।
কেন নীলষষ্ঠীর ব্রত পালন করা হয়? (Why Nil Shasthi Vrat is kept):
শিবের অপর নাম নীলকণ্ঠ বা নীল। অনেকে মনে করেন, শিবের সঙ্গে নীলচণ্ডিকা বা নীলাবতী পরমেশ্বরীর বিবাহ উপলক্ষ্যে এই লৌকিক আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়। লোককথা অনুযায়ী, দক্ষযজ্ঞে দেহত্যাগের পর সতী পুনরায় নীলধ্বজ রাজার বিল্ববনে আবির্ভূত হন। রাজা তাকে নিজের মেয়ের মতো বড় করে ফের শিবের সঙ্গে বিয়ে দেন। বাসর ঘরে মক্ষিপারূপ ধরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তা দেখে শোকে রাজা ও রানিও প্রাণ বিসর্জন দেন। তাই অনেকেই মনে করেন শিব ও নীলাবতীর বিবাহের স্মারক হল এই ‘নীল পুজো’।
নীলষষ্ঠীর সঙ্গে আরও একটি জনপ্রিয় লোককথা প্রচলিত আছে। পুরাকালে এক ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণী ছিলেন, যারা নানা ব্রত পালন করা সত্ত্বেও তাদের সন্তান বেশি দিন বাঁচত না। একদিন কাশীর গঙ্গা ঘাটের উপর বসে তারা যখন দুঃখে কাঁদছিলেন, তখন মা ষষ্ঠী বুড়ি বামনীর বেশ ধরে এসে তাদের কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করেন। ব্রাহ্মণী তার দুঃখের কথা জানালে মা ষষ্ঠী জানতে চান তারা নীলষষ্ঠীর ব্রত পালন করেছেন কিনা। যখন তারা জানান যে এই ব্রতের বিষয়ে তারা জানেন না, তখন মা ষষ্ঠী তাদের চৈত্র মাস সন্ন্যাস করে শিবের পুজো করতে এবং সংক্রান্তির আগের দিন উপোস করে সন্ধ্যায় নীলাবতীর পুজো করে নীলকণ্ঠ শিবের ঘরে বাতি জ্বালিয়ে মা ষষ্ঠীকে প্রণাম করে জল পান করার নিয়ম বলেন। মা ষষ্ঠী তাদের জানান, যারা নীলষষ্ঠীর ব্রত পালন করেন, তাদের ছেলেমেয়ে কখনও অল্প বয়সে মারা যায় না। এই কথা বলে মা ষষ্ঠী অদৃশ্য হয়ে যান। এরপর ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণী ভক্তি ভরে নীলষষ্ঠীর পুজো করেন এবং তাদের সন্তানেরা সুস্থ জীবন লাভ করে। এইভাবেই নীলষষ্ঠীর পুজোর প্রচলন শুরু হয় বলে মনে করা হয়।