“ক্রেডিট পয়েন্ট বাধ্যতামূলক, নইলে ….?”-রেজিস্ট্রেশন নবীকরণে নয়া শর্তে ক্ষুব্ধ চিকিৎসকদের একাংশ

মডার্ন মেডিসিনের চিকিৎসকদের রেজিস্ট্রেশন নবীকরণের ক্ষেত্রে নতুন শর্ত চাপাল রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিল। এবার থেকে রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হলে বাধ্যতামূলকভাবে ৩০ ঘণ্টার ‘ক্রেডিট আওয়ার পয়েন্ট’ অর্জন করতে হবে। এই নয়া নিয়ম জারির পরই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে কাউন্সিল। চিকিৎসক মহলের একাংশ এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করছেন।

চিকিৎসক সংগঠনগুলির স্পষ্ট বক্তব্য, চিকিৎসা শাস্ত্রের অগ্রগতি যেহেতু একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া, তাই কন্টিনিউয়িং মেডিক্যাল এডুকেশন (সিএমই)-এর গুরুত্ব তাঁরাও স্বীকার করেন। তবে, ন্যূনতম ৩০ ঘণ্টার ক্রেডিট পয়েন্ট অর্জনের এই বাধ্যতামূলক নিয়ম তাঁরা মানতে নারাজ। তাঁদের মতে, এই নিয়ম সবচেয়ে বেশি অসুবিধায় ফেলবে রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসকদের। কারণ, তাঁদের পক্ষে নিয়মিতভাবে সিএমই, সেমিনার বা সিম্পোজিয়ামের মতো শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কলকাতায় ছুটে আসা কার্যত অসম্ভব।

চিকিৎসকদের একাংশ আবার এই নয়া নিয়মের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের সন্দেহ, কেবলমাত্র কাউন্সিলের আয় বৃদ্ধি করার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কারণ, নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণকারী পিছু ১০০ টাকা করে কাউন্সিলকে জমা দিতে হয়। চিকিৎসক সংগঠনগুলির হিসাব অনুযায়ী, রাজ্যে প্রায় ৬০ হাজার চিকিৎসক রয়েছেন এবং প্রতি পাঁচ বছর অন্তর রেজিস্ট্রেশন আপডেট করতে হয়। অর্থাৎ, একজন চিকিৎসককে পাঁচ বছরে অন্তত ৩০ ঘণ্টা ক্রেডিট অর্জন করতে হবে, যার জন্য উদ্যোক্তার মাধ্যমে কাউন্সিল বছরে অন্তত ১ কোটি ২০ লক্ষ টাকা আয় করবে।

দক্ষিণবঙ্গের একটি মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ এই নিয়মকে ‘আজব’ আখ্যা দিয়ে বলেন, “অন্যরা সিএমই আয়োজন করবে, সার্টিফিকেট ছাপিয়ে দেবে। মেডিক্যাল কাউন্সিলের কোনও দায় নেই। শুধু অনুমতি দিয়ে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা আয় করবে!” তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, যদি এটাই নিয়ম হয়, তাহলে সিএমই-তে যাঁরা ফ্যাকাল্টি হিসেবে শিক্ষাদান করেন, তাঁদের কেন ক্রেডিট আওয়ার দেওয়া হয় না?

সরকারি চিকিৎসকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিস ডক্টর্সের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক মানস গুমটাও এই মতের সঙ্গে সহমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, “পেশাগতভাবে নিজেদের আপডেটেড রাখা প্রতিটি চিকিৎসকেরই প্রয়োজন। কিন্তু যেভাবে একটা মাপকাঠি বেঁধে দিয়ে বিষয়টিকে বাধ্যতামূলক করা হলো, আমরা তার প্রতিবাদ জানাচ্ছি।”

সার্ভিস ডক্টর্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সজল বিশ্বাস এনএমসি-র শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের বিষয়ে একটি স্পষ্ট এবং বিজ্ঞানভিত্তিক গাইডলাইন তৈরির দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “এনএমসি শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে উৎসাহিত করে, কিন্তু এ নিয়ে কোনও স্পষ্ট গাইডলাইন নেই। আমরা সেই গাইডলাইন তৈরির দাবি জানাচ্ছি। একইসঙ্গে, প্রত্যেক চিকিৎসক যাতে নিয়মিত সিএমই-তে অংশ নিতে পারেন, রাজ্য সরকার ও মেডিক্যাল কাউন্সিলকে সেই দায়িত্বও নিতে হবে।”

তবে, মেডিক্যাল কাউন্সিলের সভাপতি সুদীপ্ত রায় এই সমালোচনার বিরোধিতা করে জানান, পাঁচ বছরে ৩০ ঘণ্টার শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানে যোগদান চিকিৎসকদের উন্নতির স্বার্থেই নেওয়া হয়েছে এবং এটি তেমন কঠিন কিছু নয়। এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসক এবং মেডিক্যাল কাউন্সিলের মধ্যে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।