বিশেষ: ২৫০ বছর আগে বাংলায় এত খেজুর গাছ কারা লাগালো? আজও প্রশ্ন জাগে মানুষের মনে

শীতের আগমন মানেই গ্রাম বাংলার পথে পথে খেজুর রস সংগ্রহের মনোরম দৃশ্য। কুয়াশা ঢাকা সকালে টাটকা খেজুর রসের স্বাদ নিতে গাছিদের কাছে ভিড় করেন রসিক মানুষ। শুধু পান করাই নয়, খেজুর রসের হাঁড়ি নিয়ে ছবি তোলারও চল রয়েছে। তবে খেজুর রস সংগ্রহের এই ঐতিহ্য বাংলায় কবে থেকে শুরু হলো, সেই ইতিহাস জেনে নেওয়া যাক।

১৭৮৭ সাল থেকে শুরু…

খেজুর রস ও চিনির ইতিহাস কিন্তু আজকের নয়, বহু পুরোনো। বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথিপত্র অনুযায়ী, ১৭৭০ সালের পর যশোর অঞ্চলে স্থানীয়ভাবে চিনি উৎপাদন শুরু হয়। মনে করা হয়, তখন থেকেই মূলত খেজুর রস সংগ্রহের প্রচলন বিস্তার লাভ করে। তবে ১৮৭৬ সালের ভয়াবহ বাকেরগঞ্জ ঘূর্ণিঝড়ের কারণে খেজুর রস সংগ্রহ এবং চিনি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

১৭৯২ সালের যশোর কালেক্টরেট ভবনের একটি পরিসংখ্যান সারণিতে উল্লেখ ছিল, ‘১৭৯১ সালে ২০ হাজার মণ চিনি উৎপাদিত হয় এবং এর প্রায় অর্ধেক রপ্তানি করা হয় কলকাতায়। এছাড়াও বেতের চিনিরও যথেষ্ট উৎপাদন ছিল।’

১৮১৩ সালে খেজুরের গুড় ব্রিটেনে

‘দ্য ডেট সুগার ইন্ডাস্ট্রি অব ইন্ডিয়া’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, ১৮১৩ সালে প্রথমবারের মতো খেজুরের গুড় ব্রিটেনে পাঠানো হয়েছিল। পশ্চিমা দেশগুলোতে এই গুড়ের চাহিদা বেশ ভালো ছিল। সেই সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যের সুবাদে চিনিশিল্পও ধীরে ধীরে উন্নতি লাভ করতে শুরু করে।

চিনি শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটানোর জন্য সেই সময়ে রাস্তা, নদী ও খালের ধারে প্রচুর খেজুর গাছ রোপণ করা হয়। মনে করা হয়, এরপর থেকেই মূলত অনেকেই ‘গাছি’ হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে শুরু করেন। এমনকি সেই সময় প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই খেজুর গাছ থেকে রস বের করার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সরঞ্জাম যেমন – কয়েক রকমের দা, নলি, দড়ি, খোছানো কাঠি, গোঁজ ইত্যাদি থাকত।

একসময় প্রধানতম আবাদ ছিল খেজুর রস

বাঙালি ঐতিহাসিক সতীশ চন্দ্র মিত্রের ‘যশোহর খুলনার ইতিহাস’ বইয়ে উল্লেখ রয়েছে, ১৯০০-০১ সালে পূর্ববঙ্গে খেজুরের গুড় তৈরি হয়েছিল প্রায় ২২ লাখ মণ, যা প্রায় ৮২ হাজার টনের সমান। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, গত একশত বছরে খেজুর রসের পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পায় ৯৮ শতাংশের বেশি।

১৯৪০-এর দশকের প্রথম দিকে অবিভক্ত ভারতের পশ্চিম বঙ্গের চব্বিশ পরগনা, হাওড়া, মেদিনীপুর এবং বাংলাদেশের যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুরে এই শিল্পের দ্রুত প্রসার ঘটে। সেই সময় প্রতি বছর প্রায় এক লাখ টন গুড় উৎপাদিত হতো। তখন এক বিঘা জমিতে প্রায় ১০০টি খেজুর গাছ লাগানো হতো।

সেই সময়ে বৃহত্তর যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চলে চাষিদের প্রধানতম আবাদ ছিল খেজুর রস। শীতকালে সেখানকার জীবনযাত্রা যেন খেজুর গাছকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতো। পথে-মাঠে-ঘাটে-হাটে সর্বত্র লেগে থাকত কর্মব্যস্ততার ছবি। খেজুরের রসে ভেজা এবং গুড়-পাটালিতে রাঙানো ছিল যেন সকলের জীবন। অন্যদিকে, আড়তদাররা বড় বড় পাল্লা বসিয়ে গুড়ের কেনাবেচা করতেন।তবে সবার প্রথম কারা কি উদ্যেশে খেজুর গাছ রোপন করেছে তা আজও সঠিক ভাবে জানা যায়নি।

খেজুর গাছ লাগানোর পর সাধারণত সাত বছরের মধ্যেই সেগুলি ফল ও রস সংগ্রহের উপযোগী হয়ে উঠত। এবং অন্তত ত্রিশ থেকে চল্লিশ বছর পর্যন্ত সেইসব গাছ থেকে ফল ও রস সংগ্রহ করা যেত। তবে ১৯৫০ সালের পর থেকে ঢালাওভাবে খেজুর গাছ লাগানোর উদ্যোগ আর তেমন দেখা যায়নি। এর প্রধান কারণ হল, জমিতে খেজুর গাছ লাগালে আয় হয় মাত্র তিন মাস, কিন্তু অন্যান্য ফসল সারা বছর ধরে ফলন দেয়। এই কারণেই ধীরে ধীরে গাছের পাশাপাশি গাছিদের সংখ্যাও কমছে, আর তার সাথে কমছে খেজুর রসের উৎপাদনও।