বিশেষ: ফেসবুক, ইস্টাগ্রামে ভাইরাল Ghibli Art, কিন্তু জানেন Ghibli আসলে কী?

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘জিবলি আর্ট’ (Ghibli Art) ট্রেন্ডিং। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং ChatGPT ব্যবহার করে তৈরি জিবলি স্টাইলের ছবি ভাইরাল হচ্ছে। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেন না, এই ‘জিবলি’ আসলে কী! ‘জিবলি’ হলো জাপানের বিখ্যাত অ্যানিমেশন স্টুডিও, স্টুডিও জিবলি (Studio Ghibli)। জাপানে অ্যানিমেশন ভালোবাসেন অথচ এই স্টুডিওর নাম শোনেননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। যারা এই জাদুকরী জগৎ সম্পর্কে অবগত নন, তাদের জন্য এই প্রতিবেদনে রইল স্টুডিও জিবলির জন্মকথা এবং তাদের কাজের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক।

আরও জানুন: সহজেই তৈরি করুন আপনার পছন্দের জিবলি আর্ট ছবি, রইল পদ্ধতি

স্টুডিও জিবলির জন্ম:

১৯৮৫ সালে দুই কিংবদন্তী অ্যানিমেটর হায়াও মিয়াজাকি (Hayao Miyazaki) এবং ইসাও তাকাহাতা (Isao Takahata)-র হাত ধরে পথচলা শুরু করে স্টুডিও জিবলি। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের অ্যানিমেশন তৈরি করা। এমন অ্যানিমেশন, যেখানে জাপানের নিজস্ব সংস্কৃতি, লোককথা, ইতিহাস এবং মানুষের আবেগ গভীরভাবে মিশে থাকবে। ‘জিবলি’ নামটি এসেছে ইতালীয় শব্দ ‘ঘিবলি’ থেকে, যার অর্থ ‘গরম মরুভূমিতে বয়ে যাওয়া বাতাস’। এই নামের মাধ্যমে তারা অ্যানিমেশনের জগতে এক নতুন বিপ্লব বা ঝোড়ো হাওয়া বইয়ে দিতে চেয়েছিলেন।

মিয়াজাকির অমর সৃষ্টি:

স্টুডিও জিবলির মূল স্তম্ভ হলেন হায়াও মিয়াজাকি। তার তৈরি করা অ্যানিমেশন সিনেমাগুলো কেবল শিশুদের বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং বড়দের জন্যও এক গভীর এবং ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা। ‘My Neighbor Totoro’, ‘Spirited Away’, ‘Howl’s Moving Castle’, ‘Princess Mononoke’-এর মতো অসাধারণ চলচ্চিত্রগুলির প্রত্যেকটির গল্প ভিন্ন স্বাদের। তবে প্রতিটি গল্পের মূল সুর একই—অসাধারণ সৌন্দর্য এবং গভীরতা। ২০০১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘Spirited Away’ অর্জন করেছে অস্কারের মতো prestigious পুরস্কার। জাপানে মিয়াজাকি ঘরে ঘরে এক কিংবদন্তী শিল্পী হিসেবে পূজিত হন।

তাদের সিনেমার বিষয়বস্তুও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘Grave of the Fireflies’-এ যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরমাণু বোমায় বিধ্বস্ত জাপানে দুটি ভাইবোনের বেঁচে থাকার তীব্র সংগ্রাম এবং ভালোবাসার চিত্র ফুটে উঠেছে, তেমনই ‘The Wind Rises’-এ দেখা যায় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এক তরুণ জাপানি ইঞ্জিনিয়ারের জীবন, তার স্বপ্ন, প্রেম এবং প্রিয়জনের হারানোর বেদনা। ‘My Neighbor Totoro’-তে দুই বোনের মায়ের অসুস্থতা এবং তাকে হারানোর ভয় দর্শকদের চোখে জল এনে দেয়, তেমনই ‘Howl’s Moving Castle’-এর জাদুকরী জগৎ দর্শকদের এক স্বপ্নময় ভ্রমণে নিয়ে যায়।

জিবলি আর্ট কেন এত জনপ্রিয়?

জিবলির অ্যানিমেশন এবং চিত্রশৈলী বাস্তব এবং কল্পনার এক অসাধারণ মিশ্রণ। প্রতিটি দৃশ্যের বিশদ ব্যাকগ্রাউন্ড, হাতে আঁকা নিখুঁত চিত্রায়ণ এবং অ্যানিমেটেড চরিত্রদের সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি—সবকিছুতেই এক গভীর আবেগ এবং অনুভূতি বিদ্যমান। প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য, রহস্যময় জগৎ, অকৃত্রিম কল্পনা এবং নিখুঁত হাতের কাজই এই শিল্পকে অন্যান্য অ্যানিমেশন থেকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে।

AI দিয়ে শিল্প চাননি মিয়াজাকি:

২০১৬ সালে এক সাক্ষাৎকারে হায়াও মিয়াজাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) মাধ্যমে ছবি বা অ্যানিমেশন তৈরির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। বর্তমান ট্রেন্ডে AI মূলত জিবলি স্টুডিওর অজস্র ছবির বৈশিষ্ট্য এবং গড়ন চিনে সেগুলোকে অনুকরণ করে নতুন ছবি তৈরি করছে। এটিকে আদতে জিবলি স্টুডিওর শিল্পীদের কাজের অনুকরণ বলেই ধরা যায়। মিয়াজাকি এই পদ্ধতির সমালোচনা করে বলেছিলেন, “যাঁরাই এভাবে ছবি তৈরির ব্যবস্থা করছেন, তাঁরা জানেন না কষ্ট কী জিনিস… আমার মতে এটা হওয়া উচিৎ নয়, এটি দুঃখজনক।” তাই এই জনপ্রিয় ট্রেন্ডে গা ভাসানোর আগে, জিবলির স্রষ্টার এই মূল্যবান কথাগুলি একবার মনে রাখা প্রয়োজন।

জিবলির ভবিষ্যৎ:

স্টুডিও জিবলি এখনও তাদের নতুন নতুন সৃষ্টির মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করছে। ২০২৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘The Boy and the Heron’ আবারও প্রমাণ করেছে যে মিয়াজাকির গল্প বলার ক্ষমতা আজও অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

যদি আপনি এখনও স্টুডিও জিবলির কোনো সিনেমা না দেখে থাকেন, তবে আজই দেখা শুরু করুন। ভারতে নেটফ্লিক্সে জিবলি স্টুডিওর একাধিক জনপ্রিয় সিনেমা উপলব্ধ রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ছবিগুলির আসল সৌন্দর্য এবং গভীরতা উপলব্ধি করতে হলে জিবলি স্টুডিওর চলচ্চিত্রগুলি দেখা অপরিহার্য।