বিশেষ: শরীরে কোন বিষয়গুলো ঘটলে মানুষ হঠাৎ করে মারা যায়? জেনেনিন লক্ষণ সমূহ

আমরা প্রায়ই শুনে থাকি, ‘ইশ! লোকটা হঠাৎ করে মরে গেল!’ বা ‘ঘুমের মধ্যেই মারা গেলেন।’ এই ‘হঠাৎ মৃত্যু’ আমাদের কাছে অপ্রত্যাশিত মনে হলেও, চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণে এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু শারীরিক কারণ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হৃদপিণ্ড, শ্বাসযন্ত্র এবং মস্তিষ্কের সমস্যা এই ধরনের মৃত্যুর প্রধান কারণ। এই প্রতিবেদনে এমন কিছু কারণ ও প্রতিকার নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।
হৃদরোগ: সবচেয়ে বড় কারণ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হৃদরোগে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। হৃৎপিণ্ডে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হলে বা অক্সিজেনের ঘাটতি হলে ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’ বা হার্ট অ্যাটাক হয়। অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, “হৃদপিণ্ডের পেশি অকার্যকর হলে বা ধমনী ব্লক হয়ে গেলে তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হতে পারে। হার্ট অ্যাটাকের কয়েক মিনিটের মধ্যে চিকিৎসা না হলে মৃত্যু অনিবার্য।”
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক জানায়, হার্ট অ্যাটাকের পর তাৎক্ষণিক সিপিআর (কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন) দেওয়া গেলে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—বুকে তীব্র ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব ও কাশি। এমন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ চিকিৎসকদের।
শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা
হঠাৎ মৃত্যুর আরেকটি কারণ শ্বাসযন্ত্র অকার্যকর হওয়া বা ‘রেস্পিরেটরি ফেইলিউর’। শরীরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পৌঁছালে বা কার্বন ডাই-অক্সাইড বের না হলে এটি ঘটে। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্যমতে, এর লক্ষণগুলো হলো—শ্বাসকষ্ট, ঠোঁট বা আঙুল নীল হয়ে যাওয়া, ক্লান্তি, বিভ্রান্তি, অতিরিক্ত ঘাম ও মাথাব্যথা। ডা. আজাদ বলেন, “ছয় মিনিটের মধ্যে চিকিৎসা না হলে প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।” তবে অল্প সময়ে হাসপাতালে পৌঁছানো বা সমস্যা চিহ্নিত করা বাস্তবে কঠিন।
পালমোনারি এম্বোলিজম
ফুসফুসে রক্ত জমাট বাঁধা বা ‘পালমোনারি এম্বোলিজম’ হঠাৎ মৃত্যুর আরেকটি বড় কারণ। এতে আক্রান্তদের ৩৩% চিকিৎসা শুরুর আগেই মারা যান। লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস, প্রচুর ঘাম, বুকে তীব্র ব্যথা। ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, বা হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বাড়ে।
স্ট্রোক
মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হলে ‘স্ট্রোক’ হয়, যা হঠাৎ মৃত্যুর আরেকটি কারণ। ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মস্তিষ্কের কোষে রক্ত না পৌঁছালে বা রক্তনালী ছিঁড়ে গেলে এটি ঘটে। নিউরোসায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বলেন, “স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।” লক্ষণগুলো হলো—শরীরের একদিক অবশ, কথা জড়ানো, তীব্র মাথাব্যথা, মুখ বেঁকে যাওয়া, ভারসাম্য হারানো। দ্রুত চিকিৎসা না হলে পঙ্গুত্ব বা মৃত্যু হতে পারে।
প্রতিরোধে কী করণীয়?
“হঠাৎ মৃত্যু প্রতিরোধে সুশৃঙ্খল জীবনযাপনই একমাত্র উপায়।” তিনি ব্যালেন্সড ডায়েট, নিয়মিত ব্যায়াম, ধূমপান-মদ্যপান ত্যাগ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নের পরামর্শ দেন। তিনি আরও জানান, সমস্যা শুরুতেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি, কারণ শেষ মুহূর্তে চিকিৎসা প্রায়শই অপ্রতুল হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হৃদরোগের পর স্ট্রোক বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর দ্বিতীয় বড় কারণ। সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসাই এই অপ্রত্যাশিত মৃত্যু থেকে বাঁচতে পারে। (সূত্র: বিবিসি বাংলা)