কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি কর্মতীর্থ ভরেছে আগাছায়, রাতের আঁধারে বসে মদ -গাজার আসর

পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশিয়াড়ি ব্লকের দুধেবুধে গ্রামের পাশে অবস্থিত কর্মতীর্থটি আজ জঙ্গল আর অবহেলার শিকার। জানলা-দরজার লোহার রড চুরি হয়ে যাচ্ছে, চারপাশ আগাছায় ভরে গেছে, সাপের আনাগোনা লেগেই আছে। সন্ধ্যা নামলেই সেখানে মদ ও জুয়ার আসর বসে বলে অভিযোগ উঠেছে। আট বছর আগে প্রায় দু’কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই কর্মতীর্থ উদ্বোধনের পরও কখনও চালু হয়নি, যা নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।

২০১৬ সালের ৩ নভেম্বর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই কর্মতীর্থের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিলেন। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের জন্য সেলাই মেশিনে জামা-প্যান্ট তৈরি, নরম খেলনা, জরি শিল্প, ব্যাগ ও ন্যাপকিন তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এমনকি উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য দোকানঘরও তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু আট বছর পেরিয়ে গেলেও সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। কেশিয়াড়ি ব্লক প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির জন্য প্রায় দু’কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছিল।

স্থানীয় বাসিন্দারা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “ফাঁকা মাঠে এমন প্রকল্প করলে পড়ে থাকবে না তো কী হবে? কোটি কোটি টাকা খরচ করে সাপের থাকার জায়গা আর অসামাজিক কাজের আড্ডা বানানো হলো।” দুধেবুধে গ্রামের এক তৃণমূল নেতা বলেন, “তখনকার নেতারা সরকারকে ভুল বুঝিয়ে এই জায়গায় কর্মতীর্থ করেছিলেন। ফাঁকা মাঠে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হতে পারে, কিন্তু বাজার কীভাবে হবে? কে ওখানে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর জিনিস কিনতে যাবে? এখন সরকারের বদনাম হচ্ছে। শালডাঙায় কলেজের পাশে করলে কাজে লাগত।”

বিজেপির মেদিনীপুর সাংগঠনিক জেলার মুখপাত্র অরূপ দাস তীব্র কটাক্ষ করে বলেন, “যে সরকার কাটমানি ছাড়া চলে না, তারা মানুষের উপকারের জন্য কী করবে? কিছু নেতার পকেট ভরতেই জেনেবুঝে এই জায়গায় কর্মতীর্থ করা হয়েছিল। এখন তার ফল ভোগ করছে এলাকার মানুষ।”

কেশিয়াড়ি পঞ্চায়েত সমিতির সহ-সভাপতি দেবেন হাঁসদা বলেন, “অনেকটা ক্ষতি হয়ে গেছে। তবে এখনও কিছুটা কাজে লাগানো সম্ভব। কেশিয়াড়ি চক্রের এসআই অব স্কুলের নিজস্ব ভবন নেই। তারা কয়েকটি ঘর চেয়েছে। আরও কিছু সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা ঘরের জন্য আবেদন করেছে। তাদের দেওয়া গেলে ভবনটিকে কিছুটা কাজে লাগানো যেতে পারে। আমি প্রস্তাব জানিয়েছি, পঞ্চায়েত সমিতি কী সিদ্ধান্ত নেয় দেখা যাক।”

কেশিয়াড়ি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি উত্তম শিট বলেন, “চেষ্টা করছি ভবনটিকে অন্যভাবে কাজে লাগানোর। চারদিকে জঙ্গল হয়েছে, দরজা-জানলা চুরি গেছে। তবু ব্যবহার উপযোগী করতে উদ্যোগ নেব।” তিনি স্বীকার করেন, প্রকল্পটি তার মূল লক্ষ্য থেকে সরে গেছে, তবে এখনও তা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে।

এই ঘটনা নিয়ে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও আলোচনা চলছে। একদিকে সরকারি অর্থের অপচয়, অন্যদিকে স্থানীয়দের স্বপ্নভঙ্গ—কর্মতীর্থটি আজ শুধুই একটি পরিত্যক্ত ভবনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পঞ্চায়েতের নতুন উদ্যোগ কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা সময়ই বলবে।