“কলকাতা মেট্রোতে আত্মহত্যা” – রুখতে কী পদক্ষেপ নিলেন রেলমন্ত্রী?

ভারতের ভূগর্ভস্থ রেল পরিষেবার ক্ষেত্রে পথিকৃৎ কলকাতা মেট্রো। শহরের ‘লাইফ লাইন’ হিসেবে পরিচিত এই পরিষেবা লক্ষ লক্ষ মানুষের যাতায়াতের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মেট্রো রেল ক্রমশ ‘ডেথ লাইন’-এ পরিণত হচ্ছে। লাইনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা বেড়েই চলেছে। রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত কলকাতা মেট্রোতে ১৯ জন আত্মহত্যা করেছেন।

এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কলকাতার তৃণমূল সাংসদ মালা রায় লোকসভায় লিখিত প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানতে চান, আত্মহত্যা রোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং কলকাতা মেট্রোর সব স্টেশনে স্লাইডিং ডোর বসানোর পরিকল্পনা আছে কি না। রেলমন্ত্রীর জবাবে জানা গেছে, সল্টলেক সেক্টর ৫ থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত ১২টি স্টেশনে স্লাইডিং ডোর বসানো হয়েছে। তবে ব্লু লাইনে (দক্ষিণেশ্বর থেকে কবি সুভাষ পর্যন্ত) স্লাইডিং ডোর বসানোর কোনো পরিকল্পনা এখনো নেই।

আত্মহত্যার পরিসংখ্যান
রেলমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে কলকাতা মেট্রোতে আত্মহত্যার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। ২০২০ সালে একজনের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। ২০২২ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচে। ২০২৩ সালে চারজন এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দুইজন আত্মহত্যা করেছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ২০২৪ সালের প্রথম দুই মাসেই সাতজন আত্মহত্যা করেছেন।

আত্মহত্যা রোধে কী পদক্ষেপ?
ব্লু লাইনে স্লাইডিং ডোর না বসানোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। রেলমন্ত্রী জানিয়েছেন, ব্লু লাইনে স্লাইডিং ডোরের বিকল্প হিসেবে গার্ডরেল বসানোর পাইলট প্রকল্প শুরু করা হয়েছে। কালীঘাট স্টেশনে এই প্রকল্পের সূচনা করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, গার্ডরেল আত্মহত্যা রোধে ততটা কার্যকর নয়। ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢোকার আগে ও পরে গার্ডরেল খোলা ও বন্ধ করার প্রযুক্তিগত জটিলতাও রয়েছে।

সচেতনতামূলক প্রচার
আত্মহত্যা রোধে কলকাতা মেট্রো কর্তৃপক্ষ সচেতনতামূলক প্রচার চালাচ্ছে। ব্লু লাইনের স্টেশনগুলোতে রঙিন ব্যানার টাঙানো হয়েছে, যেখানে স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে আত্মহত্যার পরিণতির কথা। প্ল্যাটফর্মের কিনারায় হলুদ রেখা টেনে সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া, সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে যাত্রীদের ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে। কারো আচরণ সন্দেহজনক মনে হলে নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

মনোবিদের মতামত
ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডা. প্রশান্তকুমার রায়ের মতে, মেট্রো লাইনে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি হওয়ার কারণ এটি সহজলভ্য। তিনি বলেন, “যারা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে আত্মঘাতী হতে চান, তাদের ক্ষেত্রে সচেতনতামূলক প্রচার কাজে আসতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা জোরদার করা প্রয়োজন।” ডা. রায় আরও জানান, পরীক্ষায় খারাপ ফল বা সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার মতো ঘটনায় অনেকেই তাৎক্ষণিকভাবে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন। এই পরিস্থিতিতে তাদের সঙ্গে কথা বললে প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।

উপসংহার
কলকাতা মেট্রো কর্তৃপক্ষ আত্মহত্যা রোধে সচেতনতামূলক প্রচার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করলেও, স্লাইডিং ডোরের মতো কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু প্রযুক্তিগত সমাধান নয়, মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা ও সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতা মেট্রো যেন শুধু ‘লাইফ লাইন’ হিসেবেই পরিচিত হয়, সেই লক্ষ্যে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

New