“ভুয়ো ডাক্তার দেখাচ্ছি না তো?”-প্রশ্ন উঠছে রোগীর পরিবারের অন্দরে, জেনেনিন কেন?

চেম্বারের সামনে লম্বা তালিকায় চিকিৎসকদের নাম। তাঁদের নামের তলায় লেখা ‘পিজি, আরজি কর, এইমস বা কলকাতার বড় কোনও বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত’। এমডি, ডিএমের মতো ডিগ্রির পাশাপাশি বিদেশি ডিগ্রির ছড়াছড়িও চোখে পড়ে। হাতের কাছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পেয়ে অনেকে স্বস্তি বোধ করলেও, সোমবার কালনার বাঘনাপাড়ায় একটি ঘটনা সেই আস্থায় চিড় ধরিয়েছে। অপটোমেট্রিস্ট বলে নিজেকে দাবি করা এক মহিলা কালনা সুপারস্পেশালিটি হাসপাতালের চক্ষু বিশেষজ্ঞ সেজে চিকিৎসা করছিলেন। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয়দের মনে প্রশ্ন উঠেছে—বড় ডাক্তার দেখানোর ভরসায় কোথাও ফাঁক থেকে যাচ্ছে না তো?

বাঘনাপাড়ার ঘটনায় উদ্বেগ
সোমবার বাঘনাপাড়ায় স্থানীয়রা ওই মহিলাকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন। তিনি কালনা হাসপাতালের নাম ভাঙিয়ে চোখের চিকিৎসা করে যাচ্ছিলেন। এ ঘটনায় কালনা শহরের বাসিন্দা জগদীশ ঢালি বলেন, “আমরা গরিব মানুষ, লেখাপড়া বেশি জানি না। কষ্ট করে চিকিৎসক দেখাই, এটুকুই বুঝি। বাঘনাপাড়ায় যা হলো, তাতে মনে হচ্ছে আমরা ভুয়ো চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছি না তো?” তরুণ রায় নামে একজন বলেন, “চেম্বার চালানোর দায়িত্ব যাঁর, তাঁকেই চিকিৎসক যাচাই করতে হবে। তিনি জালিয়াতি করলে মানুষ ঠকবেই।”

স্বাস্থ্য দপ্তরের বক্তব্য
চেম্বারে আগত চিকিৎসকদের সত্যতা যাচাইয়ের দায় কার? পূর্ব বর্ধমানের মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক জয়রাম হেমব্রম বলেন, “নার্সিংহোম বা প্যাথলজি ল্যাবের লাইসেন্স আমরা দিই। পিসিপিএনডিটি-র (ইউএসজি) মতো বিষয়ে লাইসেন্স দেন অতিরিক্ত জেলাশাসক (স্বাস্থ্য)। কিন্তু চেম্বারে চিকিৎসকদের যাচাইয়ের দায়িত্ব আমাদের হাতে নেই। অভিযোগ থাকলে প্রশাসনকে জানানো যেতে পারে। স্বাস্থ্যের বিষয় বলে আমরা খতিয়ে দেখব।” তিনি যোগ করেন, “ওয়েস্টবেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিলের ওয়েবসাইটে রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে যে কেউ চিকিৎসকের সত্যতা যাচাই করতে পারেন।”

যাচাইয়ের উপায়
আইএএমের কালনা শাখার সভাপতি শেখ আব্দুস সামাদ বলেন, “মেডিক্যাল কাউন্সিলের সাইটে রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে সার্চ করলেই চিকিৎসকের নাম, এমবিবিএস বা এমডি-র তথ্য, এমনকি ছবি পাওয়া যায়। ন্যাশনাল মেডিক্যাল কাউন্সিলের নির্দেশে প্রেসক্রিপশনে রেজিস্ট্রেশন নম্বর, ইমেল আইডি, টেলিফোন নম্বর লেখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেকে মানেন না। প্রেসক্রিপশনে রেজিস্ট্রেশন নম্বর থাকা নিশ্চিত করতে হবে।” তিনি অতীতের একটি ঘটনার উল্লেখ করে বলেন, “২০১৩ সালে হুগলির পাণ্ডুয়ায় আমার নার্সিংহোমে একজন ভুয়ো শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ যোগ দিয়েছিলেন। সন্দেহ হওয়ায় রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট চাইতেই তিনি পালান।”

ব্যবসায়ীদের দাবি
কালনা শহরের এক ওষুধ ব্যবসায়ী, যিনি চিকিৎসকদের চেম্বারের ব্যবস্থা করেন, বলেন, “আমরা সবকিছু যাচাই করে নিই। কলকাতার অনেক চিকিৎসকের বাড়ি এই এলাকায়। তাঁরা এসে চেম্বার করেন।” তবে এই প্রক্রিয়ায় যাচাইয়ের কোনও ফাঁক থেকে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

রোগীদের দুশ্চিন্তা
বাঘনাপাড়ার ঘটনা স্থানীয়দের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে। গ্রামের মানুষের প্রশ্ন—যাঁদের কাছে চিকিৎসা করাচ্ছি, তাঁরা আদৌ সত্যিকারের চিকিৎসক কি না, তা কীভাবে বুঝব? স্বাস্থ্য দপ্তর ও চিকিৎসক সংগঠন যাচাইয়ের পথ দেখালেও, সাধারণ মানুষের পক্ষে তা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। চেম্বারে বড় বড় নাম আর ডিগ্রির ভিড়ে আস্থার পাশাপাশি অস্বস্তিও বাড়ছে।