বিশেষ: অমৃতের খোঁজে সমুদ্র মন্থন… প্রয়াগের সঙ্গে কি যোগ? জেনেনিন সেই পুরানের গল্প

উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজে ২০২৫ সালের মহাকুম্ভের প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে। তীর্থস্থান ও আধ্যাত্মিকতার এই শহর সেজে উঠেছে ভক্তদের স্বাগত জানাতে। ইতিমধ্যেই পুণ্যার্থীরা আসতে শুরু করেছেন, গঙ্গা-যমুনার ঘাটগুলি ধীরে ধীরে প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে, আখড়াগুলি কুম্ভনগরে এসে মিলিত হচ্ছে। কল্পবাসের প্রস্তুতি চলছে, সেই সঙ্গে চলছে আধ্যাত্মিক চেতনার অন্বেষণ—যা ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই যেন এক অমৃতের সন্ধান, সেই অমৃত যা মানবতাকে বাঁচিয়ে রাখার মাধ্যম।
সমুদ্র মন্থনের পৌরাণিক কাহিনী
বিষ্ণু পুরাণে বর্ণিত সাগর মন্থনের গল্পটি প্রয়াগরাজের সঙ্গমের তীরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কথিত আছে, বহু বছর আগে এই স্থানেই আকাশ থেকে অমৃতের ফোঁটা পড়েছিল। এই অমৃতের উৎস সমুদ্র মন্থন। কিন্তু কী এই সমুদ্র মন্থন? কীভাবে তা থেকে অমৃতের উৎপত্তি হল? এর বিস্তারিত কাহিনী বিষ্ণু পুরাণ, শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ, স্কন্দ পুরাণ এবং মহাভারতে লিপিবদ্ধ আছে।
দেবতা ও অসুরদের দ্বন্দ্বের কাহিনি
সত্যযুগে দেবতা ও অসুরদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরমে উঠলে, একটি মীমাংসার উদ্দেশ্যে সমুদ্র মন্থনের পরিকল্পনা করা হয়। ব্রহ্মার আদেশে ঋষি কশ্যপ প্রজাপতি দক্ষের দুই কন্যা দিতি ও অদিতিকে বিবাহ করেন। দিতির পুত্ররা দৈত্য এবং অদিতির পুত্ররা আদিত্য নামে পরিচিত হন। ত্রিদেব ও সপ্তর্ষিদের সম্মতিতে দৈত্য ও আদিত্যদের পৃথিবীতে জীবনের প্রক্রিয়া শুরু করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অদিতির পুত্র আদিত্য শান্ত ও স্থিতিশীল প্রকৃতির হওয়ায় গ্রহ-নক্ষত্রমণ্ডলীর শাসক হন এবং স্বর্গরাজ্য লাভ করেন। অন্যদিকে, দিতির পুত্র দৈত্যদের পাতালের অধিপতি করা হয়। কিন্তু অসুররা নিজেদের অবহেলিত মনে করত এবং স্বর্গ ও পৃথিবী উভয়ই দখল করতে চাইত। এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাদের হিংস্র করে তোলে এবং তারা মানবজাতির ক্ষতি করতে শুরু করে।
শুক্রাচার্যের মহাদেবের শরণাপন্ন হওয়া
দেবতা ও অসুরদের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব বারবার যুদ্ধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দেবতাদের যজ্ঞ-হোমের শক্তি থাকায় তাঁরা প্রতিবারই অসুরদের পরাজিত করতেন। অসুরদের ক্রমাগত পরাজয় ও মৃত্যুতে হতাশ হয়ে শুক্রাচার্য মহাদেবের শরণাপন্ন হন। মহাদেব, যিনি যোগীদের গুরু এবং মৃত সঞ্জীবনী বিদ্যার জনক, শুক্রাচার্যকে এই বিদ্যা দান করেন।
শুক্রাচার্য কর্তৃক সঞ্জীবনী বিদ্যা লাভ
শুক্রাচার্য মহাদেবের স্তুতি করে অসুরদের রক্ষার জন্য মৃত সঞ্জীবনী বিদ্যা প্রার্থনা করেন। মহাদেব প্রথমে জানান যে তিনি একা এই বিদ্যা দিতে পারবেন না। পরবর্তীতে, ইন্দ্র ও শুক্রাচার্য উভয়েই এক সাথে উপস্থিত হলে মহাদেব বলেন, যিনি তপস্যার মাধ্যমে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করবেন, তিনিই এই বিদ্যা লাভ করবেন। শুক্রাচার্য তপস্যায় সফল হয়ে সঞ্জীবনী বিদ্যা লাভ করেন।
দেবতাদের পরাজয় ও বিষ্ণুর পরামর্শ
সঞ্জীবনী বিদ্যার মাধ্যমে শুক্রাচার্য মৃত অসুরদের জীবিত করতে থাকলে দেবতারা যুদ্ধে পরাজিত হন এবং স্বর্গ অসুরদের দখলে চলে যায়। হতাশ দেবতারা তখন ভগবান বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। বিষ্ণু তাঁদের সমুদ্র মন্থনের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, এই মন্থন শুধু একটি শারীরিক প্রক্রিয়া নয়, দেবতাদের আত্ম-বিশ্লেষণও প্রয়োজন।
সমুদ্র মন্থনের প্রস্তুতি
বিষ্ণুর পরামর্শে দেবরাজ ইন্দ্র অসুরদের সমুদ্র মন্থনে রাজি করান। মন্দার পর্বতকে মন্থনদণ্ড এবং বাসুকী নাগকে রজ্জু হিসেবে ব্যবহার করে ক্ষীরসাগরে মন্থন শুরু হয়। এই মন্থন থেকেই অমৃতের উৎপত্তি হয়, যার ফোঁটা প্রয়াগরাজের পবিত্র ভূমিতে পড়েছিল এবং সেই স্থানেই মহাকুম্ভের আয়োজন করা হয়।
মহাকুম্ভ—এক মিলনমেলা
মহাকুম্ভ শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি মানবজাতির মিলনমেলা। এই উৎসবে মানুষ আধ্যাত্মিকতার পথে অমৃতের সন্ধান করে এবং নিজেদের পরিশুদ্ধ করে। প্রয়াগরাজের এই মহাকুম্ভ ২০২৫ সালেও সেই একই বার্তা বহন করবে।