“আর কোনওদিন কোথাও যাব না”-রাশিয়ায় কাজ করতে গিয়ে নামতে হয়েছিল ইউক্রেন যুদ্ধে!

কাজের আশায় রাশিয়া গিয়েছিলেন সুফিয়ান। কিন্তু ভাগ্যক্রমে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয়েছিল। ভয় দেখিয়ে তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল। আট মাসেরও বেশি সময় তাকে রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে কাটাতে হয়েছে। শুক্রবার হায়দরাবাদ বিমানবন্দরে ভারত সরকারের উদ্যোগে তিনি দেশে ফিরেছেন। তার সাথে আরও কয়েকজন ভারতীয় যুবকও ফিরেছেন। রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে কাটানো দিনগুলি তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বলে তিনি জানিয়েছেন। মাথার উপর বোমা, কানে গুলির শব্দ, হাড় কাঁপানো ঠান্ডা আর খাবারের অভাব – এসবই ছিল তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
সুফিয়ান বলেছেন, ‘রাশিয়ার পৌঁছনোর পরই আমাদের চুক্তিপত্র সই করানো হয়। বলা হয়েছিল রাশিয়ার সরকারের সিকিউরিটি গার্ডের কাজের জন্য এক বছরের চুক্তি। প্রতি মাসে ১ লক্ষ টাকা বেতন দেওয়া হবে। যদিও পরের দিনই আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় সেনা ক্য়াম্পে। সেখানে আমাদের ফিজিক্যাল ট্রেনিং হয়। একে১৭, একে৪৭ চালানো শেখানো হয়। তার পর স্নাইপার রাইফেলের ট্রেনিং দেওয়া হয় ২ সপ্তাহ। আমরা প্রতিবাদ করলে আমাদের পায়ের দু’দিকে গুলি করে ভয় দেখাত। প্রাণের ভয়ে আমরা চুপ করে যেতাম।‘
তিনি বলেছেন, ‘ট্রেনিংয়ের পর আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল একটি বেসক্যাম্পে। ওই বেস ক্যাম্প ইউক্রেনের মধ্যে অবস্থিত। রাশিয়া সীমান্ত থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে। সেখানে সব সময় বোমা পড়ার আওয়াজ। গুলি ছুটছে আশপাশে। খালি মনে হত এই বুঝি মরে যাব গুলি-বোমার আঘাতে। ফেব্রুয়ারি মাসে গুজরাটের এক যুবক হেমিল মাঙ্গুকিয়া ড্রোন হামলায় মারা যায়।
২৩ জন রাশিয়ান সেনা জওয়ানও ওই হামলায় মারা গিয়েছিলেন। এর পর আমরা কাজ করতে চাইনি। প্রতিবাদ করেছিলাম। শাস্তি হিসাবে আমাদের আমাদের টেন্ট থেকে বের করে দেওয়া হয়। গর্ত খুঁড়ে তার মধ্যে সারা রাত থাকতে বাধ্য করা হয়। প্রবল ঠান্ডায় এ ভাবেই কাটাতে হয়েছে আমাদের। কয়েক বোতল জল ছাড়া কিছুই খেতে দেয়নি। সেনার জন্য তাঁবু খাটানো, বন্দুক রিলোড করা, মিসাইল বইতে হত।
মাস দুয়েক আগে যুদ্ধের রেড জোন থেকে গ্রিন জোনে আনা হয়েছিল তাঁদের। যা রাশিয়ার সীমান্ত থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে। সেখানে অবশ্য যুদ্ধের তীব্রতা রেড জোনের থেকে কিছুটা কম ছিল। তাই বলে বিপদ ছিল না এমন নয়। এর পর ফের রেড তাদের রেড জোনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
সুফিয়ান বলেছেন, ‘ ভারত সরকার তাঁদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছের শুনে ফের বাঁচার আশা জন্মায় এবং আমরা অপেক্ষা করতে থাকি। তার আগে বেঁচে ফেরার আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম।’
তিনি বলেছেন, ‘মস্কোতে ফিরে আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। সরকারের তরফেই আমাদের ভারতে ফেরার ব্যবস্থা করা হয়। টিকিট কেটে দেওয়া হয়। এটা না করলে আমরা দেশে ফিরতে পারতাম না। ভারতীয় আধিকারিকরা আমাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউট নিয়েছেন। বেতনের টাকা পাব নাকি জানি না। যদি দেয় ভালো। না দিলেও ক্ষতি নেই। প্রাণে বেঁচে ফিরেছি, এটাই অনেক। ভারত সরকারকে অনেক ধন্যবাদ আমাদেরকে ফিরিয়ে আনার জন্য। আমি পরিবারকে ছেড়ে আর কোনওদিন কোথাও যাব না।’