“আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্রের প্রয়োজন”- নিষিদ্ধ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ স্থানের ছবি প্রকাশ উত্তর কোরিয়ার

প্রথমবারের মতো নিষিদ্ধ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনার ছবি প্রকাশ্যে এনেছে উত্তর কোরিয়া। এটি পারমাণবিক বোমার জন্য জ্বালানি তৈরি করে। সম্প্রতি স্থাপনাটি পরিদর্শন করেছেন উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন।
শুক্রবার (১৩ সেপ্টেম্বর) ইউরেনিয়াম স্থাপনা পরিদর্শনের সেই ছবি প্রকাশ করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি (কেসিএনএ)।
কিমের এই ছবি পশ্চিমা বিশ্বের চাপ উপেক্ষা করে পারমাণবিক কর্মসূচিতে অটল থাকার আভাস বলে মনে করা হচ্ছে।
কেসিএনএ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরমাণু অস্ত্র ইনস্টিটিউট এবং অস্ত্র-গ্রেডের পারমাণবিক উপকরণগুলোর জন্য একটি উৎপাদন ঘাঁটি পরিদর্শন করেন কিম। এ ধরনের পারমাণবিক কর্মসূচি একাধিক জাতিসংঘ নিরাপত্তা কাউন্সিল রেজোল্যুশনের অধীনে নিষিদ্ধ।
এই ছবিটি এমন এক সময় প্রকাশ করা হলো যখন উত্তর কোরিয়া তার অবৈধ পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিকে আরো জোরদার করছে।
ছবিগুলোতে দেখা যায়, কিম ধাতব সেন্ট্রিফিউজের দীর্ঘ সারিগুলোর মধ্য দিয়ে হাঁটছেন। এই মেশিনগুলো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ব্যবহার করা হয়। প্রতিবেদনে কিম এই স্থাপনাটি কখন পরিদর্শন করেছিলেন বা স্থাপনার অবস্থান স্পষ্ট করে জানানো হয়নি।
কিম কর্মীদের কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য আরো উপকরণ তৈরি করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের হুমকি মোকাবিলায় দেশের পারমাণবিক অস্ত্রাগার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘আত্মরক্ষা ও আগাম হামলার সক্ষমতার জন্য অস্ত্রের প্রয়োজন।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়ার নেতা বলেছেন, ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের নেতৃত্বাধীন সামন্ত বাহিনী’ থেকে ‘ডিপিআরকে-বিরোধী পারমাণবিক হুমকি’ সীমা অতিক্রম করেছে।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার জন্য উত্তর কোরিয়ার বেশ কয়েকটি স্থাপনা রয়েছে বলে মনে করা হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাণিজ্যিক উপগ্রহ চিত্রগুলোতে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রধান ইয়ংবিয়ন পারমাণবিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্রের নির্মাণকাজ চলছে, যার মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্ল্যান্টও রয়েছে। চিত্রগুলো উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক উপাদান উৎপাদনের ক্ষেত্রের সম্ভাব্য সম্প্রসারণকেই প্রতিফলিত করছে।
ইউরেনিয়াম একটি তেজস্ক্রিয় উপাদান যা প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান। পারমাণবিক জ্বালানী তৈরি করতে কাঁচা ইউরেনিয়াম এমন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, যার ফলে আইসোটোপ ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর বর্ধিত ঘনত্বসহ একটি উপাদান তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রসি বলেছেন, জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইয়ংবিয়নে একটি চুল্লি ও রিপোর্ট করা সেন্ট্রিফিউজ সমৃদ্ধকরণ স্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করেছে।
কিম সেন্ট্রিফিউজের সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছিলেন, যাতে পারমাণবিক অস্ত্রগুলোকে ‘দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি’ করা যায় এবং অস্ত্র-গ্রেডের পারমাণবিক পদার্থের উৎপাদনকে আরো জোরদারে একটি নতুন ধরণের সেন্ট্রিফিউজের ব্যবহার সম্প্রসারিত করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর অঙ্কিত পান্ডা বলেছেন, নতুন ধরনের সেন্ট্রিফিউজ উত্তর কোরিয়া যে তার জ্বালানি চক্রের ক্ষমতাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তা প্রকাশ করে।
তিনি বলেছিলেন, ‘কিম এমনও পরামর্শ দিয়েছেন যে, উত্তর কোরিয়ার কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রের নকশা প্রাথমিকভাবে তাদের ইউরেনিয়ামের ওপর নির্ভর করতে পারে।’
পান্ডা বলেছেন, এটি উল্লেখযোগ্য যে, প্লুটোনিয়ামের জন্য আরো জটিল প্রক্রিয়ার তুলনায় উত্তর কোরিয়া দেশটির উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ বৃদ্ধি করতে আরো সক্ষম।
উত্তর কোরিয়া ২০১০ সালে ইয়ংবিয়নে একটি সেন্ট্রিফিউজ স্থাপনা দেখার জন্য কিছু বিদেশি বিজ্ঞানীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের জেনি টাউন বলেছেন, শুক্রবারের প্রতিবেদনটিতে প্রকাশিত চিত্রটি সরঞ্জামগুলোর প্রথম এবং একমাত্র ছবি।
তিনি বলেন, ছবিগুলোতে দেখা যাচ্ছে তাদের সমৃদ্ধকরণের ক্ষমতা কতটা উন্নত হয়েছে, যা তাদের পারমাণবিক অস্ত্রাগার বাড়ানোর জন্য তাদের ক্ষমতা এবং প্রতিশ্রুতি উভয়কেই অধিকতর বিশ্বাসযোগ্যতা দেয়।’
এর আগে, উত্তর কোরিয়া কিছু ছবি প্রকাশ করেছিল যেগুলো পারমাণবিক ওয়ারহেডের ছবি বলে দাবি করেছিল তারা। ২০০৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ছয়টি ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক পরীক্ষা পরিচালনা করেছে।
সূত্র: রয়টার্স