বিশেষ: বুথফেরত সমীক্ষা কীভাবে করা হয়, এর ফলাফল কতটা সঠিক?

বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের সদ্য সমাপ্ত লোকসভা নির্বাচন বিরোধী জোটকে আরো ধসিয়ে দিয়েছে বিজেপি। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় বিভিন্ন বুথফেরত সমীক্ষা এমন পূর্বাভাসই দিয়েছে। এরপরই মূলত নতুন করে আলোচনায় ‘বুথফেরত সমীক্ষাপ’। কিন্তু বুথফেরত সমীক্ষা কী? এই সমীক্ষা কতটা সত্য হয়?
বুথফেরত সমীক্ষা হল একটি নির্বাচনী সমীক্ষা যা নির্বাচনের দিন বা তার পরের দিন ভোটারদের ভোট দেওয়ার পরে করা হয়। এই সমীক্ষার মাধ্যমে, ভোটারদের ভোটদানের অভিজ্ঞতা, তাদের ভোট দেওয়ার কারণ এবং তারা কোন দলকে ভোট দিয়েছে তা জানা যায়।

বুথফেরত সমীক্ষা পরিচালনা করার জন্য, গবেষকরা ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোটারদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এই সাক্ষাৎকারে, তারা ভোটারদের কাছ থেকে তাদের ভোটদানের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন। তারা ভোটারদের কাছ থেকে জানতে চান যে তারা কোন দলকে ভোট দিয়েছে এবং তারা কেন সেই দলকে ভোট দিয়েছে।

বুথফেরত সমীক্ষার ফলাফল সাধারণত নির্বাচনের ফলাফলের একটি পূর্বাভাস হিসেবে দেখা হয়। তবে, বুথফেরত সমীক্ষার ফলাফল সবসময় সঠিক হয় না। কিছু ক্ষেত্রে, বুথফেরত সমীক্ষার ফলাফল নির্বাচনের ফলাফল থেকে ভিন্ন হতে পারে। বুথফেরত সমীক্ষার ফলাফল নির্ণয় করার জন্য, গবেষকরা সাক্ষাৎকারে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তারা ভোটারদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে, বিভিন্ন দলের ভোটের হার নির্ধারণ করেন।

বুথফেরত সমীক্ষার কিছু সুবিধা রয়েছে। এটি নির্বাচনের ফলাফলের পূর্বাভাস দিতে পারে। এমনকি ভোটারদের ভোটদানের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তথ্য প্রদান করে। এটি ভোটারদের ভোটদানের কারণ সম্পর্কে তথ্য প্রদান করে। এর সবচেয়ে বড় অসুবিধা হলো- এটি সবসময় সঠিক হয় না!

ভারতে লোকসভা নির্বাচনে সাত দফায় ৫৪৩ আসনে সরাসরি ভোট হয়। এর আগে ২০১৪ ও ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বুথফেরত সমীক্ষা আর ভোটের প্রকৃত ফলাফলের সঙ্গে বাস্তবে কতটা মিল ছিল, সেটাও এখন আলোচনায় আসছে।

২০১৪ সালের ফলাফল

২০১৪ সালেও নির্বাচনের পরও বুথফেরত সমীক্ষা প্রকাশ করে বিভিন্ন সংস্থা। ওই সমীক্ষা নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের ক্ষমতায় আসার বিষয়টি নিয়ে পূর্বাভাস দেওয়া হয়। তবে ওই পূর্বাভাসে এনডিএর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয়ে কোনো পূর্বাভাস ছিল না।

ইন্ডিয়া টুডে-সিসেরোর সমীক্ষা বলা হয়, এবারে নির্বাচনে ২৭১ আসন পেতে যাচ্ছে এনডিএ জোট। এ ছাড়া নিউজ টোয়েন্টিফোর-চাণক্য ৩৪০ আসন, সিএনএন-আইবিএন-সিএসডিএস ২৮০, টাইমস নাউ-ওআরজি ২৪৯, এবিপি নিউজ-নিয়েলসেন ২৭৪, এনডিটিভি-হানসা রিসার্চ এনডিএর ২৭৯ আসনের পূর্বাভাস দিয়েছিল। তবে নির্বাচনের ফলাফল এসব পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এনডিএ জোট পেয়েছিল ৩৩৬ আসন। যার মধ্যে বিজেপিই পেয়েছিল ২৮১ আসন।

বুথফেরত সমীক্ষা ওই নির্বাচনে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোটের বিপুলসংখ্যক আসন হারানোর কোনো পূর্বাভাস দিতে পারেনি। ইন্ডিয়া টুডে-সিসেরোর সমীক্ষায় বলা হয়, কংগ্রেস জোট ১১৫ আসন পেতে পারে। এ ছাড়া নিউজ টোয়েন্টিফোর-চাণক্য ১০১ আসন, সিএনএন-আইবিএন-সিএনডিএস৯৭ আসন, টাইমস নাও-ওআরজি ১৪৮, এপিবি নিউজ-নিয়েলসেন ৯৭ এবং এনডিটিভি-হাসনা রিসার্চের পূর্বাভাসে জোটের ১০৩ আসনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়। তবে নির্বাচনের ফলাফল দেখা যায় পূর্বাভাসের চেয়ে অনেক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে কংগ্রেস জোট। তারা পেয়েছে মাত্র ৬০টি আসন। এর মধ্যে কংগ্রেস এককভাবে পেয়েছে ৪০টি।

২০১৯ সালের বুথফেরত সমীক্ষার ফলাফল

গত লোকসভা নির্বাচনেও বুথফেরত সমীক্ষার পূর্বাভাসই শেষ পর্যন্ত সত্যি হয়েছিল। ২০১৯ সালের নির্বাচনে ইন্ডিয়া টুডে-এক্সিসের বুথফেরত সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, এনডিএ জোট ৩৩৯ থেকে ৩৬৫টি আসনে জিততে যাচ্ছে। এ ছাড়া নিউজ টোয়েন্টিফোর-চাণক্য ৩৫০ আসন, নিউজ এইটিন-ইপসোস ৩৩৬, টাইমস নাউ-ভিএমআর ৩০৬, ইন্ডিয়া টিভি-সিএনএক্স ৩০০, সুদর্শন নিউজ ৩০৫ আসনে বিজেপির জয়ের পূর্বাভাস দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত এনডিএ জোট পেয়েছিল ৩৫২টি আসন। এর মধ্যে বিজেপি জিতেছিল ৩০৩ আসনে।

গত নির্বাচনে বুথফেরত সমীক্ষায় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোটের আবারও পরাজয়ের পূর্বাভাস পাওয়া গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত হয়েছিলও তা-ই। ইন্ডিয়া টুডে-এক্সিসের বুথফেরত সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, ইউপিএ জোট ৭৭ থেকে ১০৮টি আসন পেতে পারে। এছাড়া নিউজ টোয়েন্টিফোর-চাণক্য ৯৫ আসনে, নিউজ এইটিন-ইপসোস ৮২, টাইমস নাউ ভিএমআর ১৩২, ইন্ডিয়া টিভি-সিএনএক্স ১২০, সুদর্শন নিউজ পূর্বাভাস দিয়েছিল, ইউপিএ ১২৪ আসন পাচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত ইউপিএ জোট পেয়েছিল ৯১টি আসন। এর মধ্যে কংগ্রেস ৫২ আসনে জিতেছিল।