বাংলাদেশের এমপি আনার হত্যার মাস্টারমাইন্ড কে এই আখতারুজ্জামান?

চিকিৎসা করতে এসে খুন হওয়া ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আনোয়ারুল আজিম আনার (৫৬) আখতারুজ্জামান নামে মার্কিন এক নাগরিকের ভাড়া করা ফ্ল্যাটে ওঠেছিলেন বলে জানিয়েছেন সিআইডির আইজি অখিলেশ চতুর্বেদী।

গত ১২ মে ভারতে চিকিৎসা করাতে আসেন আনোয়ারুল। প্রথমে উঠেছিলেন বরাহনগরে এক বন্ধু গোপাল বিশ্বাসের বাড়িতে। দিন দুয়েক সেখানে থাকার পর এক দিন বাড়ি থেকে বের হন আনোয়ারুল। তার পর থেকেই আর খোঁজ মিলছিল না।

আনোয়ারুলের পরিবারও তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে অগত্যা গোপালের সঙ্গে যোগাযোগ করে। গোপাল তাদের জানান, তিনিও আনোয়ারুলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না।

সিআইডির আইজি অখিলেশ জানিয়েছেন, খোঁজ না পেয়ে গোপাল থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন। সেই অভিযোগের তদন্ত করতে একটি দল গঠন করে ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেট।

অখিলেশ বলেন, সেই তদন্ত চলছিল। তার মধ্যে ২২ মে আমরা জানতে পারি, তাকে খুন করা হয়েছে। শেষ বার যেখানে তাকে দেখা গিয়েছিল, সেই জায়গাটি খুঁজে বার করে স্থানীয় থানা। এর পরে সিআইডিকে তদন্তের ভার দেয়া হয়।

সিআইডি সূত্রে খবর, নিউটাউনের যে আবাসনে আনোয়ারুল ছিলেন বলে মনে করা হচ্ছে, সেই ফ্ল্যাটটির মালিক সরকারি কর্মচারী জনৈক সন্দীপ। তিনি আবার আখতারুজ্জামান নামে এক ব্যক্তিকে ফ্ল্যাটটি ভাড়া দেন। সিআইডির আইজি জানিয়েছেন, আখতারুজ্জামান আমেরিকার নাগরিক। কিন্তু আখতারুজ্জামানের নামে ভাড়া নেয়া ফ্ল্যাটে কী করে আনোয়ারুল থাকলেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে অখিলেশকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলেও তিনি জবাব দেননি।

অখিলেশ বলেন, ১৮ তারিখে একটি নিখোঁজ অভিযোগ দায়ের হয়েছিল। তার পর ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেট একটি এসআইটি গঠন করে। সেই তদন্ত করতে গিয়েই আমরা খবর পাই।

নিউটাউনের আবাসনের ফ্ল্যাটে রক্তের দাগ পাওয়া গিয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। সিআইডি কর্তা জানিয়েছেন, আনোয়ারের দেহ এখনও উদ্ধার হয়নি।

জানা গেছে, ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর পৌরসভার মেয়র মো. সহিদুজ্জামানের ছোট ভাই। আখতারুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। তবে আনার ভারতে অবস্থানকালে আখতারুজ্জামানও সেখানে ছিলেন। যে ফ্ল্যাটে আনার খুন হন বলে ধারণা করা হচ্ছে সেই ফ্ল্যাটে আখতারুজ্জামানও ছিলেন।

পুলিশ জানতে পারে, আক্তারুজ্জামান ও আনোয়ারুল আজীম পুরানো বন্ধু। আক্তারুজ্জামানের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহে। ঢাকায় গুলশানে আক্তারুজ্জামানের বাড়ি রয়েছে। তাঁর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব রয়েছে। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে তার বাড়ি। আনার খুনের পর তিনি নেপাল, দুবাই হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। গত ২০ মে ভিসতারা এয়ারে দিল্লি থেকে আখতারুজ্জামান নেপালের কাঠমান্ডু চলে যান। পরের দিন ফ্লাইটে করে তিনি দুবাই চলে যান। তার পরবর্তী গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র বলে জানা গেছে।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম ও আক্তারুজ্জামান ওরফে শাহীনের বিরুদ্ধে স্বর্ণ চোরাচালান ও হুন্ডিসহ আন্তর্দেশীয় বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসার তথ্য রয়েছে। দুজনের মধ্যে দ্বন্দ্বের জেরে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় বলে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন।

এ ছাড়া আনোয়ারুল ভারতে গিয়ে যে বন্ধুর বাড়ি উঠেছিলেন, সেই গোপাল বিশ্বাসও স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িত বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র থেকে জানা গেছে। আবার, সংসদ সদস্য আনোয়ারুলের বিরুদ্ধেও চোরাচালানসহ অন্তত ২১টি মামলা ছিল। যদিও পরে সেসব মামলা থেকে তিনি খালাস বা অব্যাহতি পেয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক পুলিশি সংস্থা ইন্টারপোল রেড নোটিশও জারি করেছিল। অবশ্য আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে সেটা তুলে নেওয়া হয়।

পশ্চিমবঙ্গ সিআইডির প্রধান জানিয়েছেন, পূর্ব কলকাতার নিউটাউন অঞ্চলে যে ফ্ল্যাটে আনোয়ারুল আজিম উঠেছিলেন, সেটি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আবগারি দপ্তরের কর্মকর্তা সন্দ্বীপ কুমার রায়ের। তার কাছ থেকে ফ্ল্যাটটি ভাড়া নিয়েছিলেন আখতারুজ্জামান। তিনিই ওই ফ্ল্যাটে আনারের থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম ১২ মে চিকিৎসার জন্য দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে যান। ১৬ মে থেকে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন তিনি। ২২ মে তাকে কলকাতায় খুন করা হয় বলে জানা যায়।