দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তেজনা কি সংঘাতে গড়াবে? জেনেনিন কি বলছে বিশেষজ্ঞরা?

দক্ষিণ চীন সাগরে বিরোধপূর্ণ দাবি নিয়ে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ফিলিপাইন এবং চীনের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। এরমধ্যে ফিলিপাইন সফরে গেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন। ফিলিপাইনের উপকূল রক্ষীদের নিরাপত্তা ইস্যুতে মঙ্গলবার দেশটির সঙ্গে একটি নিরাপত্তা চুক্তি প্রসারিত করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। এরপরই দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যু নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে চীন। বুধবার এক বিবৃতিতে ফিলিপাইনে চীনা দূতাবাস সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই ‘সমস্যা সৃষ্টি করা’ বা দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে পক্ষ নেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
১৯৫১ সালের একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সম্মত হয় ফিলিপাইন ও যুক্তরাষ্ট্র। ওই চুক্তির আওতায় উভয় পক্ষের যে কোনো দেশের ওপর হামলা হলে তাদের একে অপরকে সমর্থন করতে হবে। গত বছর ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র যুক্তরাষ্ট্রকে সেই নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির পরিসর স্পষ্ট করতে চাপ দিয়েছিলেন।
দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে চীন এবং আমেরিকার মধ্যে তীক্ষ্ম বাদানুবাদ হলেও, দুই দেশ এই বিরোধপূর্ণ এলাকা নিয়ে তাদের মতভেদ এতদিন পর্যন্ত, এক অর্থে, নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সংঘাতের মধ্যেও ওই এলাকার মালিকানা নিয়ে আঞ্চলিক বিবাদে কোন পক্ষ নেয়নি আমেরিকা। তারা শুধু ওই অঞ্চলে তাদের জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা দাবি করে এসেছে। সব মিলিয়ে দুই শক্তিধর দেশের মধ্যেকার উত্তাপ এখন ছড়িয়ে পড়েছে দক্ষিণ চীন সাগরেও।
প্রশান্ত মহাসাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ বলয়ে অবস্থিত দক্ষিণ চীন সাগর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ দেশ দুটির জন্য?
অর্থনীতি, কূটনীতি ও রাজনীতির দিক থেকে এই সাগর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন দাবি করে, এই সাগরের ৯০ শতাংশ তাদের। যার আয়তন দাঁড়ায় ৩০ লাখ ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার। এ ছাড়া ব্রুনাই, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান ও ভিয়েতনাম ঘেঁষে রয়েছে দক্ষিণ চীন সাগর। সে সুবাদে এই সমুদ্রের প্রাপ্য মালিকানা তারাও দাবি করে। তাদের অভিযোগ, অনেক আগে থেকে এই সাগর নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টা করছে চীন।
দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের লক্ষ্য কী?
চীন মনে করে দক্ষিণ চীন সাগর তার সমুদ্র এলাকার গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ। হাইনান দ্বীপে চীনের পারমাণবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার যে সামুদ্রিক ঘাঁটি রয়েছে শুধু সে কারণেই নয়, চীনের বিশাল বৈশ্বিক উন্নয়ন প্রকল্প, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসাবে সিল্ক রোডের সামুদ্রিক পথও এই সাগর এলাকা। ফলে চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভবিষ্যত সাফল্যের জন্য এই দক্ষিণ চীন সাগর নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা চীনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
চীন ২০১২ সাল থেকে দক্ষিণ চীন সাগরের দ্বীপগুলোতে উন্নয়ন ও বসতি তৈরির বড়ধরনের কার্যক্রম চালাচ্ছে। দ্বীপগুলোর প্রশাসনিক কাঠামো চীন উন্নত করেছে। প্যারাসেলের দ্বীপগুলোতে ছোট ছোট জেলে গ্রামগুলোতে আধুনিক আবাসন তৈরি করে দিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিক স্কুল, ব্যাংক, হাসপাতাল এবং মোবাইল যোগাযোগের ব্যবস্থা বসিয়েছে। মূল ভূখণ্ড থেকে পর্যটকরা নিয়মিত প্রমোদতরীতে দ্বীপগুলো ভ্রমণে যায়। উন্নয়নের দ্বিতীয় ধাপে স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জ অধিগ্রহণের কাজও চীন এগিয়েছে। প্রশাসনিক সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়েছে।
স্প্র্যাটলির ছোট ছোট প্রবালদ্বীপে গত ছয় বছরে চীন নৌ প্রকৌশল ও সামরিক স্থাপনা গড়ে তুলেছে, যার মধ্যে রয়েছে বিমান অবতরণ ক্ষেত্র, নৌবাহিনীর রসদের মজুদ ও বিমান ঘাঁটি, গোলবারুদের বাঙ্কার, রেডার ক্ষেত্র এবং ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক সরঞ্জাম।
উপগ্রহ ও বিমান পর্যবেক্ষণ ক্যামেরায় এসব স্থাপনার ছবি, সেইসাথে হাসপাতাল, খেলাধুলার কেন্দ্র ও বিভিন্নধরনের ভবনের ছবি ধরা পড়েছে। কোনো কোনো প্রবাল দ্বীপে গড়ে উঠেছে ফল, সবজি ও পশু খামার। এমনকী একটি প্রবাল দ্বীপের সামুদ্রিক গবেষণা কেন্দ্রে চীনা বিজ্ঞান অ্যাকাডেমিও স্থাপন করা হয়েছে ২০১৯এর জানুয়ারি মাসে। এসব প্রবাল দ্বীপের বাসিন্দারা ফাইভ-জি মোবাইল ডেটার সুবিধা ভোগ করেন।
জেলেদের হাতে এখন পৌঁছে গেছে উন্নত মাছ ধরার নৌকা, তাদের জীবন যাপন সেখানে অনেক স্বচ্ছল হয়েছে। এক কথায় দক্ষিণ চীন সাগরের এই দ্বীপগুলোর চেহারা গত ছয় বছরে অনেক বদলে গেছে।
এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র কেন?
দক্ষিণ চীন ইস্যুতে যেসব দেশের স্বার্থ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। চীনঘনিষ্ট এই ‘সংবেদনশীল’ অঞ্চলকে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ হিসেবে দেখে। কারণ, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌ বাহিনী রয়েছে ওয়াশিংটনের। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০২২ সালের মে মাসে ইন্দো-প্যাসিফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক (আইপিইএফ) চালু করেন। ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন এই অর্থনৈতিক কাঠামোতে অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানসহ ১৪টি দেশ রয়েছে। মূলত চীনের তৎপরতা ঠেকাতে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র নৌ বহর নিয়ে এই রুটে মহড়াও দেয়। তবে চীন বরাবরই তাদের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাক না গলাতে সতর্ক করে আসছে। ২০২২ সালের ৩০ ডিসেম্বর দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সামরিক যুদ্ধবিমানের কাছাকাছি চলে এসেছিল মার্কিন যুদ্ধবিমান। পরে দুদেশই এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বিবৃতি দেয়।
বাণিজ্যিক নির্ভরতা
শুধু চীন নয়, ব্রুনাই, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, তাইওয়ান ও ভিয়েতনাম বাণিজ্যিকভাবে চীন সাগরের ওপর নির্ভর করে। বিশ্লেষকরা বাণিজ্যগত গুরুত্ব বিবেচনায় চীন ছাড়া পাঁচটি দেশের নাম সুপারিশ করেছে- ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া।
ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অনুসারে, ২০১৬ সালে দক্ষিণ চীন সাগরের মধ্য দিয়ে প্রায় ৩ দশমিক ৩৭ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের বাণিজ্য হয়েছিল। যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের ২১ শতাংশ। ২০২১ সালে ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট জানায়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৪০ শতাংশের বেশি সমুদ্রপথে হয়। শুধু এশিয়াতেই সামুদ্রিক বাণিজ্যের ৫৪ ভাগ পরিচালিত হয়।
চীনের তৎপরতা
পশ্চিমা কর্মকর্তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক মহলের বাধা উপেক্ষা করে দক্ষিণ চীন সাগরে ‘ভূমি’ দখলদারিত্ব চালিয়ে যাচ্ছে বেইজিং। ইতোমধ্যে তারা প্রবালপ্রাচীরে ঘেরা দ্বীপের এলাকা কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দখল করেছে। দ্বীপগুলোতে তারা সামরিকীকরণ করে বন্দর, রানওয়ে, হেলিপ্যাড ও বিমানঘাঁটির মতো অন্য অবকাঠামো স্থাপন করেছে। সেখানে যুদ্ধবিমান নামানোরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত কয়েকটি স্যাটেলাইট ছবিতে সেসব চিত্র উঠে এসেছে।
দক্ষিণ চীন সাগরের ওই বিতর্কিত অঞ্চলকে (স্প্রাটলি) নিজেদের বলে দাবি করে ব্রুনেই, তাইওয়ান, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ইন্দেনেশিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশও। কয়েক বছর ধরে এ অঞ্চল ঘিরে তাদের মধ্যেও উত্তেজনা বিরাজ করছে। চীন তাদের দাবি মোকাবেলায় ওই ঘাঁটিগুলো বানিয়েছে। কারণ, দক্ষিণ চীন সাগরের ওই অংশেই রয়েছে তেল ও গ্যাসের আধার। স্প্রাটলি ছাড়াও পারাসেল দ্বীপেও চীন তার আধিপত্য কায়েম করেছে।
চীন যতই দাবি করুক, দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের অধিকার সিংহভাগ। তবে ২০১৬ সালে হেগের আদালত তাদের সেই অধিকারকে সমর্থন দেয়নি। ২০১৩ সালে ফিলিপাইনের করা ওই মামলার রায়ে আদালত বলেছিল, চীন যে নাইন ড্যাশ লাইনের ঐতিহাসিক দাবি করে, তার আইনি কোনো ভিত্তি নেই।
সমুদ্র আইন কী বলে
জাতিসংঘের সমুদ্র আইন অনুযায়ী, যে কোনো স্বাধীন দেশ তাদের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সামুদ্রিক অংশ দাবি করতে পারে। আর ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত অঞ্চলকে বলা হয় এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন। অর্থাৎ এই অঞ্চলে উপকূলীয় যে কোনো দেশ প্রাকৃতিক সম্পদ আরোহণ, এমনকি কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণেরও স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে। এই আইন অনুযায়ী, চীনের যে দাবি তাতে ফাঁক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ চীন সাগরের অংশীদারত্বগুলোর দাবি, চীন এই আইন মানছে না। তবে চীনের দাবি, তারা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে কোনো বাধা সৃষ্টি করে না।
এদিকে এই সমুদ্র দাবিদার দেশগুলো আশা করে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেবে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন বিষয়ে বিশ্লেষক মার্ক ভ্যালেন্সিয়ার মতে, জাতিসংঘ সমুদ্র আইন সনদে যুক্তরাষ্ট্র সই করেনি। সেটি না করেও স্বাধীনভাবে নৌযান চালানোর সুবিধা ভোগ করার সুযোগ চাওয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলার অধিকার নেই।