পুজোর অনুদান বনাম স্কুলের দুরবস্থা, বাঁকুড়ায় শিক্ষার হাল নিয়ে প্রশ্ন

দুর্গাপূজার জন্য রাজ্য সরকার কোটি কোটি টাকা অনুদান বরাদ্দ করায় যখন উৎসবের আমেজ তুঙ্গে, তখনই বাঁকুড়া জেলার কেঞ্জাকুড়া গ্রামের এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেহাল দশা সরকারের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। পুজো কমিটিগুলিকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তে বিরোধীরা যখন অর্থ অপচয় এবং কর্মচারীদের ডিএ না দেওয়ার অভিযোগ তুলছে, তখন কেঞ্জাকুড়ার ধগড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের করুণ চিত্র সেই বিতর্কের আগুনে আরও ঘি ঢালছে।
বাঁকুড়া ১ নম্বর ব্লকের সমৃদ্ধ গ্রাম কেঞ্জাকুড়ায় একাধিক দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়, যার বেশিরভাগই বছরের পর বছর ধরে সরকারি অনুদান পেয়ে আসছে। অথচ, এই গ্রামেই অবস্থিত ধগড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে গ্রামবাসীরা দীর্ঘকাল ধরে এর সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছেন।
বিদ্যালয়টির ছয়টি শ্রেণিকক্ষের মধ্যে চারটিই ছাদ চুঁইয়ে জল পড়ে। প্লাস্টারের চাঙড় খসে পড়ার ঘটনা এতটাই নিত্যনৈমিত্তিক যে শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে শিক্ষকরাও চিন্তিত। বেশিরভাগ দরজা-জানালা বন্ধ করা যায় না। বাকি দুটি কক্ষে ৬৩ জন শিক্ষার্থীকে কোনোমতে বসিয়ে পাঠদান চলে। শিশু শ্রেণি থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পাঁচটি ক্লাসের জন্য মাত্র দুইজন শিক্ষক রয়েছেন, যা শিক্ষার মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। শৌচালয়ের দেওয়াল ভাঙা এবং ব্যবহারের অযোগ্য হওয়ায় দুর্ঘটনার ভয়ে শিক্ষকরা শিশুদের সেখানে যেতে নিষেধ করেন। এছাড়া, দুটি নলকূপ থাকলেও সেগুলোর জল পান করার অযোগ্য বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। স্কুলের যাতায়াতের রাস্তাটি আরও করুণ। বর্ষায় কাদা এতটাই জমে থাকে যে জুতো পরে স্কুলে যাওয়া অসম্ভব। শিক্ষার্থীরা বাড়ি থেকে চপ্পল পরে বেরোলেও স্কুলের পথে সেটি হাতে নিয়ে কাদা মাড়িয়ে যেতে হয়। একইভাবে পাশের ধগড়িয়া আইসিডিএস কেন্দ্রেও শিশুরা পৌঁছায় চরম দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে।
অভিভাবকদের দাবি, পুজোর অনুদান যদি নাও পাওয়া যায়, তাহলে হয়তো দু-এক বছর পুজোর জৌলুস কমবে। কিন্তু সামান্য কিছু সরকারি বদান্যতা পেলেই স্কুলের হাল ফিরতে পারে এবং তাদের সন্তানদের শিক্ষার মান উন্নত হতে পারে। তাই সরকারের আশু মনোযোগ শিক্ষার উন্নতির দিকে হওয়া উচিত।
বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র তরজা শুরু হয়েছে। বিজেপি বিধায়ক নীলাদ্রি শেখর দানা সরাসরি আক্রমণ করে বলেছেন, “শিশুরা ভোটার নয়, তাই তাদের প্রাপ্তির ভাঁড়ার শূন্যই থাকছে। অথচ সরকারি টাকায় দেদার মেলা, খেলা, উৎসবের অনুদানের নামে চলছে ভোটের রাজনীতি।” তিনি আরও বলেন, “ক্লাবে টাকা দিন অসুবিধা নেই, কিন্তু তার সঙ্গে উন্নয়নেও জোর দেওয়া দরকার।” সিপিএমের দাবি, যে শিক্ষা শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে পারে, সেদিকে রাজ্য সরকারের নজর নেই। উৎসবের অনুদানের জৌলুসে মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলি ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।
তবে রাজ্যের শাসকদল বিরোধীদের অভিযোগ মানতে নারাজ। তাদের দাবি, শিক্ষা এবং উৎসব দুটোই সমান্তরালভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই শিক্ষাক্ষেত্রে বিপুল উন্নয়নের পাশাপাশি পুজোর অনুদানের প্রতিও রাজ্য সরকার সমানভাবে নজর দিয়েছে। এই বিতর্কের জল কতদূর গড়ায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।