পরমাণু অস্ত্রভান্ডার বাড়াচ্ছে ভারতও, জেনেনিন কোন কোন দেশে সবচেয়ে বেশি মজুত?

বিশ্ব এখন এক ভয়ঙ্কর নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। যেখানে শান্তি ও কূটনীতির পরিবর্তে পরমাণু ক্ষমতা বাড়ানোই যেন দেশগুলির একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI)-এর সর্বশেষ রিপোর্ট ২০২৪ সালের এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের ৯টি পরমাণু অস্ত্রধারী দেশ বর্তমানে তাদের অস্ত্র আধুনিকীকরণ এবং পরিমাণ বৃদ্ধিতে জোর কদমে কাজ করে চলেছে, যা মানবজাতির ভবিষ্যৎকে এক নতুন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
প্রলয়ের সংখ্যাতত্ত্ব: ১২,২৪১টি পরমাণু অস্ত্র!
২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত, সারা বিশ্বে আনুমানিক ১২,২৪১টি পরমাণু অস্ত্র মজুত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯,৬১৪টি সামরিক মজুদের অংশ এবং ৩,৯১২টি মোতায়েনযোগ্য অবস্থায় রয়েছে, যা যেকোনো মুহূর্তে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ২,১০০টি অস্ত্র রয়েছে ‘উচ্চ সতর্কতা’ অবস্থায়, যার অধিকাংশই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তির হাতে। এই সংখ্যাগুলোই বলে দিচ্ছে বিশ্ব কতটা বিপজ্জনক এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
রাশিয়া-আমেরিকা: ৯০% অস্ত্রের মালিক, চুক্তির ভবিষ্যৎ অন্ধকার
বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ পরমাণু অস্ত্রের মালিকানা এই দুই পরাশক্তির হাতে। রাশিয়া ও আমেরিকা উভয়েই তাদের অস্ত্র আধুনিকীকরণে ব্যস্ত। ২০১০ সালের New START চুক্তি ২০২৬ সালে শেষ হবে, এবং SIPRI রিপোর্টে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, নতুন চুক্তির সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে, পরমাণু অস্ত্রের মোতায়েন আরও বাড়তে পারে, যা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।
চিনের ‘বিপুল অগ্রগতি’: ঘুম ভাঙছে বিশ্বের!
চিন এখন দ্রুততার সঙ্গে তার পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার বাড়াচ্ছে। ২০২৩ সাল থেকে দেশটি বছরে ১০০টি করে নতুন পরমাণু অস্ত্র যোগ করছে। ২০২৫ সালের মধ্যে চিনের মোট পরমাণু অস্ত্রের সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়েছে, এবং প্রক্ষেপণ করা হচ্ছে যে ২০৩৫ সালের মধ্যে চিনের কাছে ১৫০০টি পরমাণু অস্ত্র থাকতে পারে। চিনের এই বিপুল অগ্রগতি বিশ্বের অন্যান্য পরাশক্তিগুলির জন্য নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারত ও পাকিস্তানের প্রস্তুতি: আঞ্চলিক উত্তেজনার ঢেউ
ভারতও পিছিয়ে নেই। ২০২৪ সালে ভারত ৮টি নতুন অস্ত্র যুক্ত করেছে। নতুন ক্যানিস্টারাইজড মিসাইল তৈরি করেছে, যা শান্তিকালেও মোতায়েনযোগ্য। কিছু ক্ষেপণাস্ত্র একাধিক ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম হবে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, পাকিস্তানও নতুন ডেলিভারি সিস্টেম তৈরি করছে এবং পরমাণু উপাদান মজুত বাড়াচ্ছে। ২০২৫ সালের গোড়ার দিকে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা পরমাণু সংকটের ঝুঁকি তৈরি করেছিল, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
অন্যান্য পরমাণু দেশগুলির অবস্থা: কেউই থেমে নেই!
- ব্রিটেন: ২০২৪ সালে সংখ্যা না বাড়ালেও, ভবিষ্যতে ৪টি নতুন পরমাণু সাবমেরিন তৈরির পরিকল্পনা করছে।
- ফ্রান্স: অস্ত্র আপগ্রেড, নতুন সাবমেরিন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে ব্যস্ত।
- উত্তর কোরিয়া: বর্তমানে ৫০-৫৮টি অস্ত্র রয়েছে এবং আরও ৪০টি তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।
- ইজরায়েল: অস্ত্র থাকার বিষয়টি প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও, পরমাণু প্রযুক্তি ও ক্ষমতা বজায় রেখেছে।
প্রযুক্তির নতুন খেলা: পরমাণু নীতির ওপর AI-এর প্রভাব
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সাইবার টেকনোলজি এবং মহাকাশ প্রযুক্তি পরমাণু প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ নীতিতে বড় প্রভাব ফেলছে। এই নতুন প্রযুক্তিগুলি পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকিকে আরও জটিল করে তুলছে, কারণ এগুলো দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াচ্ছে।
SIPRI-এর এই রিপোর্ট বিশ্বকে এক নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। পরমাণু অস্ত্রের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং আধুনিকীকরণ বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবজাতি কি এই প্রলয় থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে, নাকি এক নতুন সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাবে—ভবিষ্যৎই তার উত্তর দেবে।