মহাজাগতিক বোমা! বিস্ফোরিত হতে চলেছে বিরল তারা যুগল, দূরত্ব মাত্র ১৫০ আলোকবর্ষ
মহাকাশে এক বিরল তারা যুগলের সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা, যারা সময়ের সাথে সাথে একে অপরের দিকে এগিয়ে আসছে এবং একদিন ভয়াবহ বিস্ফোরণে বিলীন হয়ে যাবে। ‘ইউনিভার্সিটি অফ ওয়্যারউইক’-এর বিজ্ঞানীরা এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের দাবি করেছেন।
গবেষকদের মতে, এই দুটি তারা ধীরে ধীরে সর্পিল পথে পরস্পরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং এক নাটকীয় মহাজাগতিক ঘটনার মাধ্যমে তারা বিস্ফোরিত হবে। সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বিষয় হল, এই ঘটনাটি আমাদের সৌরজগৎ থেকে মাত্র দেড়শ আলোকবর্ষ দূরে ঘটছে। মহাজাগতিক বিচারে এই দূরত্ব খুবই কম, এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ধরনের ঘটনা পর্যবেক্ষণের জন্য এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কাছের উদাহরণ।
এই তারা দুটি হল শ্বেত বামন – সূর্যের মতো তারারা যখন তাদের জীবনের শেষ পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন তারা এই ঘন অবশিষ্টাংশ ফেলে যায়। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই বিশেষ বামন জোড়া একটি অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কক্ষপথে আবদ্ধ রয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত তারা একে অপরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হবে, যার ফলস্বরূপ সৃষ্টি হবে ‘টাইপ ১ এ’ সুপারনোভা।
‘টাইপ ১ এ’ সুপারনোভা হল এক প্রকার শক্তিশালী নাক্ষত্রিক বিস্ফোরণ, যা মূলত একটি বাইনারি সিস্টেমে কার্বন-অক্সিজেন সমৃদ্ধ শ্বেত বামনের নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটে। প্রায়শই এটি সঙ্গী তারা বা অন্য একটি শ্বেত বামনের সাথে সংঘর্ষের কারণে তৈরি হয়। এই বিস্ফোরণগুলি এতটাই উজ্জ্বল হয় যে, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের দূরত্ব পরিমাপ করার জন্য ‘স্ট্যান্ডার্ড ক্যান্ডেল’ হিসেবে টাইপ ১ এ সুপারনোভাকে ব্যবহার করেন।
দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, কাছাকাছি কক্ষপথে থাকা দুটি শ্বেত বামনের সংঘর্ষের মাধ্যমেই বেশিরভাগ টাইপ ১ এ সুপারনোভা তৈরি হয়। যখন তারা একে অপরের চারপাশে ঘুরতে থাকে, তখন ভারী তারাটি তার হালকা সঙ্গীর থেকে উপাদান টেনে নেয়। এক পর্যায়ে যখন তারাটির ভর একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করে, তখন সেটি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না এবং এক শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে। তবে এত কাছাকাছি অবস্থিত এমন কোনও নিশ্চিত সিস্টেম আগে কেউ খুঁজে পায়নি।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, নতুন আবিষ্কৃত এই সিস্টেমটির মোট ভর একটি শ্বেত বামন জোড়ায় দেখা যাওয়া সর্বোচ্চ ভরের মধ্যে অন্যতম, যা সূর্যের ভরের প্রায় ১.৫৬ গুণ। এই বিপুল ভর নিশ্চিত করে যে, সিস্টেমটি শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরিত হবে। এর মধ্যে একটি শ্বেত বামনের ভর প্রায় ০.৮৩ সৌর ভর এবং অন্যটির ভর প্রায় ০.৭২ সৌর ভর। যদিও এই বিস্ফোরণ ঘটতে এখনও প্রায় দুই হাজার তিনশ কোটি বছর সময় লাগবে, তবে ‘বাড়ির এত কাছে’ এমন একটি সিস্টেমের সন্ধান পাওয়ায় বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত উৎসাহিত।
বর্তমানে তারা দুটি প্রতি ১৪ ঘণ্টায় একে অপরকে প্রদক্ষিণ করছে। সময়ের সাথে সাথে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের প্রভাবে তারা সর্পিলভাবে আরও কাছাকাছি আসবে। বিস্ফোরণের ঠিক আগমুহূর্তে, তারা দুটি সম্ভবত মাত্র ৩০ থেকে ৪০ সেকেন্ডের মধ্যে একে অপরকে শেষবারের মতো প্রদক্ষিণ করবে।
বিজ্ঞানীদের অনুমান, এই বিস্ফোরণটি আমাদের আকাশের অন্য যেকোনো ঘটনার চেয়ে আলাদা হবে। এটি পূর্ণিমার চাঁদের চেয়ে ১০ গুণ বেশি উজ্জ্বল এবং বৃহস্পতি গ্রহের চেয়ে দুই লাখ গুণ বেশি উজ্জ্বল দেখাবে। বিস্ফোরণটি একটি বিরল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটবে, যাকে বিজ্ঞানীরা ‘চতুর্মুখী বিস্ফোরণ’ বলছেন, যেখানে একটি বিস্ফোরণ অন্য বিস্ফোরণের একটি চেইন তৈরি করবে এবং উভয় তারাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেবে।
এই বিস্ময়কর আবিষ্কার টাইপ ১ এ সুপারনোভা কীভাবে ঘটে, সে সম্পর্কে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি স্পষ্ট ধারণা দিয়েছে এবং মহাকাশের অনেক বড় রহস্য সমাধানের দিকে তাদের আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল।