বিশেষ: ‘ডেভিলস কিচেন’ বিশ্বের অন্যতম রহস্যময় গুহা, জেনেনিন কোথায় এই শয়তানের রান্নাঘর ?

ডেভিলস কিচেন, অথবা শয়তানের রান্নাঘর—নামটি শুনলেই যেন গা ছমছম করে ওঠে। রহস্যময় আর ভয়ংকর এই গুহার কথা হয়তো অনেকেরই জানা। তবে, বিশেষ করে ভারতীয় মালায়ালাম ভাষার সারভাইভাল থ্রিলার সিনেমা ‘মনজুম্মেল বয়েজ’ মুক্তি পাওয়ার পর এই গুহার নাম প্রায় সকলের কাছেই পরিচিত হয়েছে। সিনেমাটি শুধু প্রতি মুহূর্তে উত্তেজনা ধরে রাখেনি, বরং বন্ধুত্বের গভীরতাকেও নতুন করে মনে করিয়েছে—বন্ধুর জন্য বন্ধুরা নিজেদের জীবনও তুচ্ছ করতে পারে।
যাই হোক, ফেরা যাক সেই রহস্যময় ডেভিলস কিচেনে। এই গুহার আসল নাম গুনা কেভ বা গুনা গুহা। ভারতের তামিলনাড়ুর কোড়াইকানালে অবস্থিত এই গুহাটি ‘শয়তানের রান্নাঘর’ নামেই বেশি পরিচিত। প্রতি বছর বহু পর্যটক এই স্থানটি পরিদর্শনে আসেন।
১৯৯১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত কমল হাসান অভিনীত জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘গুনা’তে এই স্থানটি প্রদর্শিত হওয়ার পরই এর নাম হয় গুনা গুহা। ছবিটি মুক্তির পর থেকেই স্থানটিতে দর্শনার্থী ও পর্যটকদের ভিড় বাড়তে শুরু করে। পরবর্তীকালে আরও কয়েকটি চলচ্চিত্রের শুটিং এখানে হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল মালয়ালম চলচ্চিত্র ‘শিক্কার’ (২০১০)-এর ক্লাইম্যাক্স এবং সাম্প্রতিক সময়ের সাড়া জাগানো মালয়ালম চলচ্চিত্র ‘মনজুম্মেল বয়েজ’ (২০২৪)। ‘মনজুম্মেল বয়েজ’ গুহায় ঘটে যাওয়া একটি বাস্তব দুর্ঘটনার উপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছে।
তবে এখানকার গুহাগুলোর ইতিহাস বেশ কুখ্যাত। বহু পর্যটক এখানে ঘুরতে এসে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে গেছেন। কিছু ক্ষেত্রে গুহার কাঠামো অত্যন্ত গভীর ও এবড়োখেবড়ো হওয়ায় কর্তৃপক্ষ তাদের মৃতদেহ উদ্ধার করতেও সক্ষম হয়নি। এটি বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক গুহা হিসেবে পরিচিত। ২০১৬ সাল পর্যন্ত পুলিশ এই গুহার সাথে সম্পর্কিত ১৬টি নিখোঁজের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে, যেখানে মৃতদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আজ পর্যন্ত কেবল একজন ব্যক্তি গুনা গুহার গভীরতা থেকে জীবিত অবস্থায় ফিরে আসতে পেরেছেন, যা ২০২৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মালয়ালম চলচ্চিত্র ‘মনজুম্মেল বয়েজ’-এর মূল আখ্যানের ভিত্তি।
১৮২১ সালে ব্রিটিশ অফিসার বিএস ওয়ার্ড প্রথমবার এই গুহার গর্তটি নথিভুক্ত করেন এবং তিনি এর নাম দেন ‘দ্য ডেভিলস কিচেন’ বা শয়তানের রান্নাঘর। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকের শেষ পর্যন্ত এটি তেমন পরিচিত ছিল না। ১৯৯১ সালে কমল হাসান অভিনীত ‘গুনা’ চলচ্চিত্রের প্রধান অংশের শুটিং এই গুহা ও এর আশেপাশের এলাকাতেই হয়। চলচ্চিত্রের নামানুসারে এটি গুনা গুহা নামেই পরিচিতি লাভ করে এবং পর্যটকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
এরপর বহু মানুষ গুহায় প্রবেশ করে দুর্ঘটনার শিকার হন এবং রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যান, এমনকি অনেকের মৃতদেহও উদ্ধার করা যায়নি। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালে নিখোঁজ হওয়া এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ভাতিজার ঘটনার রহস্য আজও অমীমাংসিত। কিছু ঘটনা আত্মহত্যা বলে মনে করা হলেও, অনেক পর্যটক বা স্থানীয় গুহাটি অন্বেষণ করতে গিয়ে ভেতরের বিপজ্জনক গর্তে পড়ে নিখোঁজ হয়ে যান।
এই কারণে ২০০০-এর দশকের শুরু থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত গুহায় নিখোঁজের সংখ্যা বাড়তে থাকায় জনসাধারণের জন্য এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অনেকেই গোপনে জায়গাটি অন্বেষণ করতেন। ২০১৬ সালে পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, গুহায় অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০০৬ সালে গুনা গুহার গভীর গর্ত থেকে কোনও ব্যক্তির জীবিত অবস্থায় বেরিয়ে আসার একমাত্র উদাহরণ নথিভুক্ত আছে।
২০০৬ সালে কেরালার মনজুম্মেল কোচির একদল বন্ধু গুহা পরিদর্শনে গেলে সুভাষ নামে একজন ব্যক্তি গর্তে পড়ে যান। পরবর্তীতে পুলিশ ও মূলত তার বন্ধু সিজু ডেভিড এবং স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটিই ২০২৪ সালের মালায়ালাম চলচ্চিত্র ‘মনজুম্মেল বয়েজ’-এ চিত্রিত হয়েছে, যা গুনা গুহাগুলির জনপ্রিয়তা আরও বহু গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও গুহায় শুটিংয়ের ঝুঁকি থাকায় বেশিরভাগ অংশের শুটিং ফিল্ম সেটে করা হয়েছিল, কিছু অংশ আসল গুহা এবং কোদাইকানাল ও তার আশেপাশেও শুট করা হয়।
২০২৪ সাল পর্যন্ত, পর্যটকদের আগ্রহের কথা মাথায় রেখে গুহার রাস্তাটি জনসাধারণের জন্য পুনরায় খুলে দেওয়া হয়েছে, তবে পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে গুহার প্রবেশদ্বার এখনও বন্ধ রাখা হয়েছে।
তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া।