বাজারে ঝড় তোলা ডিপসিক শেষ পর্যন্ত কী করল? জেনেনিন সর্বশেষ আপডেট

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার ঠিক এক সপ্তাহ আগে চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অ্যাপ ডিপসিক (DeepSeek) সিলিকন ভ্যালিতে এক নতুন ঢেউ তুলেছিল। রাতারাতি, অ্যাপলের ইউএস অ্যাপ চার্টে সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড হওয়া ফ্রি অ্যাপ হিসেবে এর ‘ডিপসিক-আর১’ সংস্করণটি শীর্ষে উঠে আসে। কোম্পানিটি তখন দাবি করেছিল যে তাদের এই নতুন চ্যাটবট শুধু ওপেনএআই-এর চ্যাটজিপিটি-র প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং এটি তৈরিতে তাদের খরচও হয়েছে অনেক কম।
এই দাবি এবং হঠাৎ করে এর জনপ্রিয়তার কারণে মার্কিন চিপ নির্মাতা এনভিডিয়া-র বাজারমূল্য একদিনেই ৬০ হাজার কোটি ডলার কমে যায়, যা এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের ইতিহাসে কোনো একক কোম্পানির জন্য একদিনে সবচেয়ে বড় পতন। ডিপসিকের এই আকস্মিক আগমন এআই শিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল। কারণ এর আগে অনেকেই মনে করতেন, এআই খাতে চীনের অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক পিছিয়ে।
‘এআইয়ের স্পুটনিক মুহূর্ত’ এবং পরবর্তী অধ্যায়
ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট মার্ক আন্দ্রেসেন ‘ডিপসিক-আর১’-এর আগমনকে ‘এআইয়ের স্পুটনিক মুহূর্ত’ বলে বর্ণনা করেন। এটি এমন এক ঘটনার ইঙ্গিত দেয়, যেমনটা ঘটেছিল যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের স্পুটনিক স্যাটেলাইট মহাকাশ প্রতিযোগিতার সূচনা করেছিল। ডিপসিক ঠিক সেইরকমই এআই শিল্পে নতুন এক প্রতিযোগিতার জন্ম দিয়েছে।
তবে, যে ডিপসিক বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল, ছয় মাস পেরোতে না পেরোতেই তা খবর থেকে হারিয়ে গেছে। সান ফ্রান্সিসকোতে এখন আর এটি আলোচনার কেন্দ্রে নেই, তবে পুরোপুরি মুছেও যায়নি।
ডিপসিক এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, যা ওপেনএআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যানের মতো প্রযুক্তি নির্বাহীরা আগে সমর্থন করতেন। এআই চিপ স্টার্টআপ ‘ডি-ম্যাট্রিক্স’-এর সিইও সিড শেথ বলেন, “আমরা এমন এক পথে ছিলাম যেখানে বড় হওয়াকে আরও ভালো বলে মনে করা হতো।” ডিপসিক প্রমাণ করে দেখিয়েছে যে এআইকে চালানোর জন্য সবসময় ডেটা সেন্টার, সার্ভার এবং চিপের সর্বোচ্চ ব্যবহারই একমাত্র পথ নয়।
ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তার উদ্বেগ এবং নতুন কৌশল
ডিপসিকের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়ে গিয়েছিল জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে। এর জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে অনেক কোম্পানি তড়িঘড়ি করে তাদের কর্মীদের অ্যাপটি ব্যবহার করতে নিষেধ করে। এর কারণ ছিল মার্কিন ব্যবহারকারীদের ডেটা চীনের সঙ্গে শেয়ার হওয়ার উদ্বেগ, যেখানে ডিপসিকের সদর দপ্তর অবস্থিত।
তবে এখনও অনেক আমেরিকান ডিপসিক ব্যবহার করছেন। খরচ কমানোর জন্য সিলিকন ভ্যালির কিছু কোম্পানি ও স্টার্টআপ আমেরিকার দামি এআই মডেলের পরিবর্তে ডিপসিক ব্যবহার করছে। তারা মনে করে, এতে যে অর্থ বাঁচে তা কর্মী নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে সাহায্য করে।
চীনের সঙ্গে ডেটা শেয়ারের ঝুঁকি এড়াতে ব্যবহারকারীরা অনলাইন ফোরামে এমন উপায় খুঁজছেন যাতে ডিপসিককে তাদের নিজেদের ডিভাইসে চালানো যায়। ‘মিল পন্ড রিসার্চ’-এর সিইও ক্রিস্টোফার কেইন বলেছেন, “এটিই ডিপসিক ব্যবহার করার সেরা উপায়।”
প্রতিযোগিতা এবং ভবিষ্যতের পথে ডিপসিক
কিছু বিশেষজ্ঞ বলছেন, ডিপসিকের আগমন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এআই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এক মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছিল। মার্কেটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজ-এর বিশ্লেষক ওয়েন্ডি চ্যাং বলেছেন, “ওই সময় পর্যন্ত চীনকে ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ তৈরিতে পিছিয়ে থাকা দেশ হিসেবে দেখা হতো।” ডিপসিক দাবি করেছিল যে তারা খুব কম খরচে শীর্ষস্থানীয় মডেল তৈরি করেছে, যা এআই মডেল তৈরির ধারণাকে বদলে দিয়েছে।
তবে নিজেদের চীনা শেকড়ের কারণে তৈরি হওয়া নিরাপত্তা উদ্বেগ কখনো কমাতে পারেনি ডিপসিক। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, তাদের ধারণা ডিপসিক ইচ্ছাকৃতভাবে চীনের সামরিক ও গোয়েন্দা কার্যক্রমে সহায়তা করেছে এবং ভবিষ্যতেও করতে পারে। ডিপসিক এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি, তবে তাদের প্রাইভেসি নীতিতে বলা আছে যে তাদের সার্ভার চীনে অবস্থিত।
‘ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি সিডনি’-এর অধ্যাপক মারিনা ঝাং বলেন, “এখন ডিপসিককে তার গতি ধরে রাখতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।” উচ্চমানের চিপের ঘাটতির কারণে তাদের পরবর্তী ‘ডিপসিক-আর২’ মডেলটি সময়মতো আসছে না। অন্যদিকে, এনভিডিয়া-র শেয়ারের দাম আবার নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং এখন এটি বিশ্বের সবচেয়ে দামি কোম্পানি। এর মাধ্যমে বলা যায়, ডিপসিক যে বদল আনতে চেয়েছিল তা বেশিদিন টেকেনি।