বিশেষ: গুপ্তচর তেলাপোকা আর এআই রোবট, বদলে যাচ্ছে যুদ্ধ লড়াইয়ের হিসেবে ও প্রযুক্তি

ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর ইউরোপের প্রতিরক্ষা খাতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। জার্মানির মিউনিখ-ভিত্তিক প্রতিরক্ষা স্টার্টআপ হেলসিং-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা গুন্ডবার্ট শার্ফের চোখেই যেন এই পরিবর্তনের প্রতিফলন। চার বছর আগেও সামরিক ড্রোন ও যুদ্ধক্ষেত্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) তৈরিতে বিনিয়োগকারী টানতে শার্ফকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছে, কিন্তু এখন তাঁর কোম্পানির মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার, যা ইউরোপের সবচেয়ে মূল্যবান প্রতিরক্ষা স্টার্টআপের খেতাব এনে দিয়েছে।
শার্ফ বলেছেন, “কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রতিরক্ষা খাতের প্রযুক্তি কেনায় যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করছে ইউরোপ।” রয়টার্সের এক বিশেষ নিবন্ধে উঠে এসেছে, কেবল শার্ফের স্টার্টআপ নয়, গত কয়েক বছরে ইউরোপের প্রতিরক্ষা-কেন্দ্রিক বোঝাপড়ায় এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে। ‘ম্যাককিনজি অ্যান্ড কোম্পানি’র প্রাক্তন অংশীদার শার্ফ মনে করেন, ইউরোপ হয়তো প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে এমন এক বড় পরিবর্তনের সামনে দাঁড়িয়ে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ম্যানহাটন প্রজেক্টের সমতুল্য হতে পারে।
‘প্রতিরক্ষা সচেতন হচ্ছে ইউরোপ’ – জার্মানির ভূমিকা
রয়টার্স দুই ডজনেরও বেশি কর্মকর্তা, বিনিয়োগকারী ও নীতিনির্ধারকের সঙ্গে কথা বলে জার্মানির এই নতুন ভূমিকা পরীক্ষা করেছে। সূত্রগুলো রয়টার্সকে জানিয়েছে, জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎসের সরকার বিশ্বাস করে যে, এআই এবং নতুন স্টার্টআপ প্রযুক্তি তাদের দেশের প্রতিরক্ষা শক্তি বাড়াতে অপরিহার্য। ফলে, সরকার স্টার্টআপগুলির জন্য সরকারি জটিলতা কমাচ্ছে, যাতে তারা সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারে এবং দ্রুত নতুন প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে পারে।
নাৎসি সামরিক শাসনের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী শান্তির প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকারের কারণে জার্মানি দীর্ঘ দিন ধরে নিজেদের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রকে ছোট ও সতর্কভাবে পরিচালনা করে আসছিল। তারা মূলত আমেরিকার নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপরই নির্ভরশীল ছিল। ঐতিহ্যগতভাবে ঝুঁকির বিষয়ে অনাগ্রহী হওয়ায় জার্মানি বড় ধরনের পরিবর্তনের চেয়ে ছোট ছোট উন্নতিকে বেশি পছন্দ করত। কিন্তু পরিস্থিতি এখন বদলেছে। মার্কিন সামরিক সাহায্য আগের মতো নিশ্চিত না হওয়ায় ইউক্রেনের অন্যতম বড় সমর্থক জার্মানি ২০২৯ সালের মধ্যে নিজেদের সাধারণ প্রতিরক্ষা বাজেট তিন গুণ করে প্রতি বছর প্রায় ১৬ হাজার ২০০ কোটি ইউরো করার পরিকল্পনা করছে। বিভিন্ন সূত্র বলছে, এই বিপুল অর্থ যুদ্ধ করার পদ্ধতি সম্পূর্ণ নতুনভাবে তৈরি করার কাজে ব্যয় করা হবে।
নতুন প্রজন্মের প্রতিরক্ষা স্টার্টআপ: রোবট থেকে ‘সামরিক তেলাপোকা’
জার্মানির নতুন প্রতিরক্ষা স্টার্টআপগুলির মধ্যে অন্যতম হেলসিং। এই স্টার্টআপটি ট্যাংকের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন রোবট, মনুষ্যবিহীন মিনি-সাবমেরিন থেকে শুরু করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ‘গুপ্তচর তেলাপোকা’ পর্যন্ত অত্যাধুনিক প্রযুক্তি তৈরি করছে। শার্ফ বলেছেন, “আমরা চাই ইউরোপ আবার শক্তিশালী ও দৃঢ় হয়ে উঠুক ও নিজের মেরুদণ্ড ফিরে পাক।”
বিভিন্ন সূত্র আরও জানিয়েছে যে, জার্মানির পুরনো বড় কোম্পানি যেমন ‘রাইনমেটাল’ ও ‘হেনসোল্ট’-এর পাশাপাশি এখন কিছু ছোট কোম্পানিও সরকারকে পরামর্শ দিচ্ছে। বড় কোম্পানিগুলোর লক্ষ্য এখন আর নতুন উদ্ভাবন নয়, কারণ তাদের হাতে প্রচুর পুরনো প্রকল্পের কাজ বাকি। তাই ছোট আকারের বিভিন্ন কোম্পানি নতুনত্বের ওপর বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
রয়টার্সের কাছে থাকা জার্মানির ২৫শে জুনের এক খসড়া আইন অনুসারে, জার্মানির সরকার নতুন একটি আইন আনতে চলেছে, যা ছোট ও অর্থের অভাবে সমস্যায় থাকা বিভিন্ন স্টার্টআপের জন্য সরকারি টেন্ডারে অংশগ্রহণ সহজ করবে। এই আইনের মাধ্যমে এসব স্টার্টআপ আগে থেকেই কিছু অর্থ পাবে, যা তাদের কাজ শুরু করা সহজ করবে এবং বড় বড় সরকারি প্রকল্পে অংশ নেওয়া ও নতুন ব্যবসার সুযোগ পেতে সাহায্য করবে। এই আইন অনুসারে, সরকার চাইলে টেন্ডার কেবল ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে পারবে।
অটোনোমাস বা স্বয়ংক্রিয় রোবট নির্মাতা ‘এআরএক্স রোবোটিক্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মার্ক উইটফেল্ড বলেছেন, জার্মান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াসের সঙ্গে সাম্প্রতিক এক বৈঠকে বার্লিন এ নিয়ে কতটা গভীরভাবে নতুন করে চিন্তা করছে তা স্পষ্ট হয়েছে। মার্ক বলেছেন, “জার্মান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আমাকে বললেন, অর্থ আর কোনো অজুহাত নয়, এখন আমাদের কাছে অর্থ আছে। তার এমন মন্তব্য ছিল বড় এক পরিবর্তনের মোড়।”
জার্মানি এখন নেতৃত্বে ও উদ্ভাবনের পুনরুত্থান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নেটোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলার পর জার্মানি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ২০২৯ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে মোট রাজস্বের প্রায় সাড়ে তিন শতাংশ খরচ করবে তারা। এই বিষয়ে ইউরোপের বেশিরভাগ মিত্র দেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে জার্মানি।
বার্লিনের কর্মকর্তারা বলেছেন, কেবল আমেরিকান কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল না থেকে ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। তবে জার্মানি ও পুরো ইউরোপে বড় এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা কোম্পানি গড়ে তোলার পথে এখনও অনেক বাধা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইউরোপে বাজারটি খণ্ড খণ্ডভাবে বিভক্ত। ইউরোপের প্রতিটি দেশেরই নিজস্ব সরকারি ক্রয় নিয়ম-কানুন রয়েছে, যা কোনো চুক্তি পেতে হলে তাদের মানতে হয়।
তবে আশার কথা, ‘সাইবার ইনোভেশন হাব’-এর প্রধান স্ভেন ওয়েইজেনেগার জানিয়েছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ সামাজিক মনোভাবে পরিবর্তন এনেছে এবং প্রতিরক্ষা খাতে কাজ করার জন্য মানুষের নেতিবাচক ধারণাও দূর করেছে। তিনি এখন প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০টি লিংকডইন ‘অ্যাড রিকোয়েস্ট’ পাচ্ছেন, যেখানে ২০২০ সালে সপ্তাহে মাত্র দুই থেকে তিনটি পেতেন।
এই উন্নয়নের অধীন কিছু ধারণা বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর মতো শোনাতে পারে। যেমন ‘সোয়ার্ম বায়োট্যাকটিক্স’ কোম্পানির তৈরি সাইবর্গ তেলাপোকা, যেগুলোর ছোট ছোট বিশেষ ধরনের ব্যাকপ্যাক রয়েছে। এর মাধ্যমে ক্যামেরা ব্যবহার করে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে এরা। বিদ্যুৎ সংকেতের মাধ্যমে দূর থেকে এসব তেলাপোকার চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রতিকূল পরিবেশে নজরদারির তথ্য সরবরাহ করা, যেমন শত্রুর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা।
‘সোয়ার্ম বায়োট্যাকটিক্স’ কোম্পানির সিইও স্টেফান উইলহেল্ম বলেছেন, “আমাদের এসব বায়ো রোবট জীবন্ত পোকামাকড়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যেগুলো স্নায়ু উদ্দীপনা, সেন্সর ও সুরক্ষিত যোগাযোগ প্রযুক্তি দিয়ে সাজানো রয়েছে। এগুলোকে আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে জোট বেঁধেও চলতে পারে এরা।”
রয়টার্স আরও লিখেছে, বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে জার্মান বিজ্ঞানীরা ব্যালিস্টিক মিসাইল, জেট বিমান ও নিয়ন্ত্রিত অস্ত্রসহ অনেক সামরিক প্রযুক্তিতে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর জার্মানিকে সামরিকভাবে নিষ্ক্রিয় করা হয় এবং তাদের এই বৈজ্ঞানিক প্রতিভা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। যেমন, নাৎসিদের জন্য প্রথম ব্যালিস্টিক মিসাইল তৈরি করা ওয়েরনার ফন ব্রাউন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নাসায় কাজ করেন এবং অ্যাপোলো মহাকাশযানকে চাঁদে নিয়ে যাওয়ার রকেট তৈরি করেন।
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে অর্থনৈতিক অগ্রগতির এক শক্তিশালী চালক হিসেবে কাজ করেছে প্রতিরক্ষা খাতে উদ্ভাবন। ইন্টারনেট, জিপিএস, সেমিকন্ডাক্টর ও জেট ইঞ্জিনের মতো বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রথমে সামরিক গবেষণা থেকে এসেছে, এরপর সাধারণ মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন এনেছে সেগুলো। উচ্চ জ্বালানি মূল্যের চাপ, রপ্তানির চাহিদা কমে যাওয়া ও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণে জার্মানির ৪.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গত দুই বছরে ছোট হয়েছে। এই অবস্থায় সামরিক গবেষণা বাড়ানো দেশটির অর্থনীতিকে চাঙা করে তুলতে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।