“লেখা তো বটেই, মুখের ভাষাও বদলে দিচ্ছে চ্যাটজিপিটি”- বলছে গবেষণা

জুম মিটিং, অনলাইন ক্লাসরুম বা ইউটিউব ভিডিও—নিত্যদিনের ডিজিটাল যোগাযোগে একটি অদ্ভুত প্রবণতা এখন গবেষকদের নজরে। অনেকেই লক্ষ্য করছেন, মানুষের কথা বলার ধরণে এক অদ্ভুত মিল চলে এসেছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিবর্তন আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), বিশেষ করে চ্যাটজিপিটির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ফল। মানুষের ভাষা কি তবে এআইয়ের ছাঁচে ঢালাই হচ্ছে?
‘ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট’-এর গবেষকরা ইউটিউবের প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার শিক্ষামূলক ভিডিও বিশ্লেষণ করে চমকপ্রদ তথ্য পেয়েছেন। তারা দেখেছেন, ‘Prowess’ (দক্ষতা) বা ‘tapestry’ (বোনা নকশা)-এর মতো কিছু শব্দ, যা চ্যাটজিপিটি বেশি ব্যবহার করে, তা এখন মানুষের কথ্য ভাষায়ও ব্যাপক হারে ঢুকে পড়ছে। অন্যদিকে, ‘bolster’ (সহায়তা করা), ‘unearth’ (আবিষ্কার করা) ও ‘nuance’ (সূক্ষ্ম পার্থক্য)-এর মতো শব্দ, যা চ্যাটজিপিটি কম ব্যবহার করে, সেগুলোর ব্যবহার মানুষের মধ্যে কমে যাচ্ছে। প্রযুক্তি বিষয়ক সাইট ভার্জের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষকরা বলছেন, চ্যাটজিপিটি আসার আগে মানুষের ভাষায় এত বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। এটি স্পষ্টতই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মানুষের ভাষা ও কথাবার্তায় এআইয়ের কারণে দ্রুত পরিবর্তন আসছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়বে।
‘ডেলভ’ শব্দের রহস্য: এআইয়ের অদৃশ্য ‘স্ট্যাম্প’
এই গবেষণায় ‘delve’ (গভীরে খোঁজাখুঁজি করা) শব্দটি বিশেষভাবে গবেষকদের নজর কেড়েছে। বর্তমানে এটি যেন মানুষের ভাষার গায়ে লেগে থাকা চ্যাটজিপিটির এক অদৃশ্য ছাপ। অনেক শিক্ষামূলক ভিডিও বা আলোচনায় এখন এই শব্দটি প্রায়শই শোনা যায়। যেমন – “আজকে আমরা এই বিষয়ে একটু ডেলভ করব।” আগে যেখানে মানুষ ‘ভালোভাবে দেখি’ বা ‘গভীরে গিয়ে বুঝি’ বলতেন, এখন সেই জায়গায় অবলীলায় ‘ডেলভ’ শব্দটি চলে আসছে।
এ গবেষণার প্রধান গবেষক ড. হিরোমু ইয়াকুরা বলেছেন, “আমরা না বুঝেই এসব ভার্চুয়াল শব্দভাণ্ডারকে আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তার ভেতরে টেনে নিচ্ছি।”
শুধু শব্দ নয়, বদলে যাচ্ছে প্রকাশের ধরণও:
গবেষকরা বলছেন, বিষয়টি কেবল মানুষ কীভাবে এআইয়ের ভাষা ব্যবহার করছে তা নয়, বরং ধীরে ধীরে মানুষ এআইয়ের মতো শোনাতে শুরু করেছেন। মানুষের কথা এখন আগের চেয়ে বেশি গোছানো, দীর্ঘ ও কাঠামোগত। অথচ আগে মানুষের মুখের ভাষায় যে স্বাভাবিক আবেগ, হাসি, ক্ষোভ ও উত্তেজনা থাকত, সেগুলো অনেকটাই চাপা পড়ে যাচ্ছে।
‘ডেলভ’ শব্দের ব্যবহারকে ‘হিমশৈলের চূড়া’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন সহলেখক লেভিন ব্রিঙ্কম্যান, ইঙ্গিত দিয়ে যে এর নীচে আরও অনেক বড় পরিবর্তন লুকিয়ে আছে। স্মার্ট রিপ্লাই, অটোকারেক্ট ও স্পেলচেকের মতো ফিচারগুলো এই পরিবর্তনের স্পষ্ট উদাহরণ।
আস্থার সংকট ও মানবিক সংকেতের অবলুপ্তি:
কর্নেল ইউনিভার্সিটির গবেষকদের মতে, স্মার্ট রিপ্লাই ব্যবহার করলে চ্যাটিং পার্টনারদের মধ্যে সহযোগিতা ও ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি বাড়ে। কিন্তু যখন একজন চ্যাটিং পার্টনার সন্দেহ করেন যে তার সামনের ব্যক্তি হয়তো এআই ব্যবহার করে উত্তর দিচ্ছেন, তখনই পরিস্থিতি বদলে যায়। তখন মনে হয় সামনের জন কম সহযোগী ও রোবটের মতো আচরণ করছেন। এআই ব্যবহৃত হয়েছে কি না, তা এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়; কেবল সন্দেহই অস্বস্তি তৈরি করে।
কর্নেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মোর নামান বলছেন, এখানে একটি অদ্ভুত দোটানা কাজ করছে। এআই একদিকে যেমন আমাদের যোগাযোগকে সুন্দর ও সহজ করে তুলছে, তেমনই একইসঙ্গে সন্দেহ ও অবিশ্বাসও বাড়াচ্ছে, যা এক গভীর আস্থার সংকট তৈরি করেছে। তিনি মনে করেন, এআই ব্যবহারের ফলে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ‘মানবীয় সংকেত’ হারিয়ে যাচ্ছে:
১. মানবিক সংকেত: যা মানুষের ভেতরের মানুষটাকে প্রকাশ করে, যেমন – দুর্বল মুহূর্তের স্বীকারোক্তি বা ব্যক্তিগত অভ্যাস।
২. মনোযোগ ও প্রচেষ্টার সংকেত: যা বোঝায় “আমি নিজের হাতে সময় নিয়ে তোমার জন্য এটি তোমার জন্য লিখেছি।”
৩. দক্ষতা বা ব্যক্তিত্বের সংকেত: মানুষের রসবোধ, চিন্তা করার সক্ষমতা, ব্যক্তিত্ব—যা মানুষের বাস্তবতা প্রকাশ করে।
নামান উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, “আমি দুঃখিত, তোমার মন খারাপ” (এআই-সদৃশ) বনাম “আমি দুঃখিত, রাতের খাবারের জন্য হঠাৎ করে খুব বেশি রেগে গিয়েছিলাম আমি, আমার সম্ভবত এই সপ্তাহে থেরাপিস্টের কাছে যাওয়া উচিত ছিল” (মানবিক)। দ্বিতীয় বাক্যে আছে অপরাধবোধ, ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তি ও আবেগের রং।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ: মানুষের কি নিজস্বতা থাকবে?
নামান আরও বলেছেন, এআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগের এই নতুন দুনিয়ার ভবিষ্যৎ পথ হচ্ছে, মানুষের মধ্যে থেকে যেসব মানবিক সংকেত হারিয়ে গিয়েছে, সেগুলোকে আবার ফিরিয়ে আনা এবং এসব বিষয়কে আরও গুরুত্ব দেওয়া। কারণ সমস্যা কেবল মানুষের ভাষা বদলে যাওয়ার নয়, বরং ধীরে ধীরে মানুষের চিন্তাধারাও বদলে দিচ্ছে এআই।
তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, “আজকাল ডেটিং অ্যাপে কেউ যদি প্রোফাইলে মজার কিছু লেখেন, আমরা কীভাবে জানব ওটা তিনিই লিখেছেন, না কি এআই লিখে দিয়েছে? তাহলে বর্তমানে প্রোফাইলে বা চ্যাটিংয়ে মজা করার মানে আসলে কী?” নামান সবচেয়ে বেশি চিন্তিত এই ভেবে যে, মানুষ ধীরে ধীরে নিজের মতো করে ভাবা ও প্রকাশের বিষয়টিই ভুলে যাচ্ছেন। তিনি সতর্ক করেছেন, মানুষের নিজের বলার সক্ষমতা হারিয়ে গেলে মানুষ কেবল মুখোমুখি কথা বলাকেই বিশ্বাস করতে পারবেন, এমনকি ভিডিও কলেও কথা বলতে অসুবিধে হবে।
গবেষকরা বলছেন, ভবিষ্যতে মানুষের ভাষার ধরণ কেমন হবে, তা বলা মুশকিল। তবে প্রশ্নটা হলো: আমরা কি চেষ্টা করব আমাদের ভাষার সেই অগোছালো আবেগ, ছোট ছোট ব্যতিক্রমী বিষয় ও নিজস্ব ঢংগুলোকে ধরে রাখতে— যেগুলোই মূলত মানুষকে মানুষ করে তোলে? এই ‘ঝাঁঝ’, এই ‘গড়বড় ভাষাটাই’ তো আসলে জীবন্ত যোগাযোগের প্রমাণ, যা কোনো এআইই পুরোপুরি কপি করতে পারবে না, কারণ সেটা অপরিকল্পিতভাবে একেবারেই অনুভূতির বিষয়।