আইএসএসে পা রাখলেন প্রথম ভারতীয় শুভাংশু শুক্লা, ৪১ বছর পর মহাকাশে ভারতীয় নভোচারী!

মহাকাশ গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে প্রথম ভারতীয় হিসেবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (ISS)-এ পা রেখে ইতিহাস গড়লেন নভোচারী গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু শুক্লা। ১৯৮৪ সালের পর এই প্রথম কোনো ভারতীয় মহাকাশে গেলেন, যা ভারতের মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। সরাসরি টেলিভিশন সম্প্রচারে দেখা গেছে, ‘এক্সিয়ম-৪’ মিশনটি মহাকাশ স্টেশনের সঙ্গে সফলভাবে ডকিং করেছে, এবং এরপর ওই মিশনে থাকা চার নভোচারী ISS-এর ভেতরে প্রবেশ করেছেন।

‘এক্সিয়ম-৪’ মিশনের বিস্তারিত:

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার সাবেক নভোচারী পেগি হুইটসনের নেতৃত্বে এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু শুক্লার পরিচালনায় ‘এক্সিয়ম-৪’ মিশনটি বুধবার ভারতীয় সময় দুপুর ১২টা ১ মিনিটে ফ্লোরিডার নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে যাত্রা শুরু করে। এই বাণিজ্যিক মহাকাশযাত্রাটি পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনভিত্তিক ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানি ‘এক্সিয়ম স্পেস’।

মিশনের অন্য সদস্যরা হলেন – পোল্যান্ডের স্লাওসজ উজনানস্কি-উইসনিয়েস্কি এবং হাঙ্গেরির তিবোর কাপু। বৃহস্পতিবার ভারতীয় সময় বিকাল ৪টায় মহাকাশযানটি ISS-এর সঙ্গে সফলভাবে ডকিং করে। এরপর মহাকাশযান ও মহাকাশ স্টেশনের মধ্যে নিরাপদ সংযোগ তৈরি হলে উভয় পাশের দরজা খুলে যায় এবং মহাকাশচারীরা ISS-এর ভেতরে প্রবেশ করেন। বিবিসি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চারজন যোগ দেওয়ায় বর্তমানে ISS-এ থাকা নভোচারীর সংখ্যা ১১ জনে দাঁড়িয়েছে।

ভারতের মহাকাশ ইতিহাসে নতুন অধ্যায়:

গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুক্লা মহাকাশে যাওয়া দ্বিতীয় ভারতীয়। এর আগে ১৯৮৪ সালে প্রথম ভারতীয় হিসেবে রুশ সয়ুজ মহাকাশযানে করে মহাকাশে গিয়েছিলেন নভোচারী রাকেশ শর্মা। ৪১ বছর পর ভারতের এই নতুন মহাকাশযাত্রা দেশের মহাকাশ গবেষণায় এক নতুন প্রেরণা জোগাবে।

এই যৌথ উদ্যোগে অংশ নিয়েছে নাসা, ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো, ইউরোপের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইএসএ এবং ইলন মাস্কের মহাকাশ কোম্পানি স্পেসএক্স। এই মিশনের মাধ্যমে চার দশকেরও বেশি সময় পরে আবার নিজেদের দেশের হয়ে মহাকাশে গেলেন ইউরোপের দুই নভোচারীও।

গবেষণা ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা:

দুই সপ্তাহের এই মিশনে নভোচারীরা মূলত ৬০টি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালাবেন। এর মধ্যে সাতটি পরীক্ষার নকশা তৈরি করেছে ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো। গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুক্লার জন্য এ মিশনে একটি আসন এবং তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য পাঁচশ কোটি রুপি খরচ করেছে ইসরো। সংস্থাটি জানিয়েছে, ISS-এ অবস্থানের সময় শুক্লার হাতে-কলমে যে অভিজ্ঞতা হবে, তা দেশের ভবিষ্যতের মহাকাশ মিশনে খুবই কাজে লাগবে।

ইসরো ২০২৭ সালে প্রথমবারের মতো মহাকাশে নভোচারী পাঠাতে চায়। পাশাপাশি, ২০৩৫ সালের মধ্যে একটি নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন তৈরি এবং ২০৪০ সালের মধ্যে চাঁদে একজন মহাকাশচারী পাঠানোরও ambitious পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির।

শুভাংশু শুক্লার প্রথম মহাকাশ অভিজ্ঞতা:

বৃহস্পতিবার সকালে নভোচারীদের সঙ্গে লাইভে কথা বলেছে এক্সিয়ম স্পেস কোম্পানি। সেখানে গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুক্লা মহাকাশে নিজের প্রথম ২৪ ঘণ্টার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলেছেন। তিনি বলেন, “কী অসাধারণ এক যাত্রা! মহাকাশে কেবল ভেসে থাকার বিষয়টি অসাধারণ এক অনুভূতি।” একইসঙ্গে তিনি “মজার সময়ও পার করেছেন” বলে জানান।

শুক্লা হেসে আরও বলেন, “আমরা যখন মহাকাশের শূন্যে ভাসছিলাম তখন আমার ভালো বোধ হচ্ছিল না। তবে আমাকে বলা হয়েছে, আমি নাকি অনেক ঘুমিয়েছি, যা একটি ভালো লক্ষণ। আমি মহাকাশের এই দৃশ্য, এই অভিজ্ঞতা উপভোগ করেছি এবং আবার নতুন করে সবকিছু শিখছি। ঠিক যেমন একটি শিশু হাঁটতে, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে, খেতে ও পড়তে শেখে তেমন।”

এই মিশন ভারতের মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্থাপন করল। ভবিষ্যতে ইসরোর আরও বড় মহাকাশ অভিযানগুলোর জন্য এটি এক শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করবে।